- বাংলাদেশের পাঁচ খাতে বিনিয়োগে জাপানি কোম্পানিগুলোকে আহ্বান তারেক রহমানের
- পেটের চর্বি কি পুরুষের যৌনক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে?
- আগামী বছর থেকে স্কুলে জাপানিসহ কয়েকটি বিদেশি ভাষা চালুর পরিকল্পনা: প্রধানমন্ত্রী
- ব্যালন ডি’অরে কে কোন পুরস্কার জিতলেন, জেনে নিন
- আইইডিসিআর পরিচালকের ওপর হামলা ঘটনায় জামায়াতের নিন্দা
- মা হারালেন চিত্রনায়িকা পপি
- মাদরাসায় বেশি জিপিএ-৫, এবার স্কুলের সঙ্গে একই প্রশ্নে পরীক্ষা: শিক্ষামন্ত্রী
- ঘূর্ণিঝড় অর্ণবে অন্ধপ্রদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, নিহত ২
- ১৮৫ কেন্দ্রের ১১৫টিই ঝুঁকিপূর্ণ, কড়া নিরাপত্তায় মাঠে এসআরবি
- খেজুরের বিস্ময়কর গুণ
অনলাইন গেমের নেশা মানসিক অসুখ, মুক্তির উপায়
অনলাইন ও ভিডিও গেম এখন শিশু-কিশোর ও তরুণদের কাছে বিনোদনের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম। একবার গেম খেলতে বসলে অনেকেই সহজে ডিভাইস ছেড়ে উঠতে চায় না। কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে ফ্রি ফায়ার, ডটএ-২, পাবজি, কল অব ডিউটির মতো গেমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছে তারা। এতে পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা ও পারিবারিক সময় ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনলাইন গেমের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ ও আসক্তি অভিভাবকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। অনেক সময় গেমস খেলার আসক্তির কারণে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অনলাইন গেম খেলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পড়ার টেবিলের বদলে স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় মনোযোগ দিচ্ছে অনেকে। কৌতূহল ও বিনোদনের জন্য গেম খেলা শুরু হলেও কারও কারও ক্ষেত্রে তা দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন গেমের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা মানসিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গেম খেলার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো, পড়াশোনা বা অন্যান্য দায়িত্ব অবহেলা করা এবং ক্ষতি হওয়ার পরও খেলা চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক। তবে সব ধরনের গেম খেলা আসক্তি নয়; যখন এ অভ্যাস দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ব্যক্তিগত, পারিবারিক, শিক্ষাগত বা সামাজিক জীবনে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করে, তখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
গেমের আকর্ষণীয় নকশা, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ ও বন্ধুদের সঙ্গে খেলার প্রবণতা শিশু-কিশোরদের দীর্ঘ সময় গেমে ব্যস্ত রাখতে পারে। এর ফলে পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত পড়াশোনা, শারীরিক ব্যায়াম এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যেতে পারে। কিছু গেমের সহিংস দৃশ্য নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তবে সব গেমের প্রভাব এক রকম নয়; বয়স উপযোগিতা, খেলার সময় এবং শিশুর ব্যক্তিগত পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রাম ও মফস্বলেও শিশু-কিশোরদের মধ্যে ভিডিও গেম খেলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও খেলার মাঠে সময় কাটানোর বদলে দলবেঁধে মোবাইল বা কম্পিউটারে গেম খেলছে তারা। এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাঁদের আশঙ্কা, গেমে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার কারণে শিশু-কিশোরদের পড়াশোনা, শারীরিক কার্যক্রম এবং পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন গেমের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিশুদের জন্য বয়স উপযোগী গেম নির্বাচন, স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নির্ধারণ, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দেওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি গেম খেলার কারণে আচরণে বড় পরিবর্তন, ঘুমের সমস্যা, পড়াশোনায় অবনতি কিংবা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া উচিত।
তবে গেম খেলার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে তা মানসিক স্বাস্থ্য, শারীরিক সুস্থতা, পড়াশোনা, কর্মজীবন ও পারিবারিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত গেমিংয়ের অভ্যাস উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিন্যাসের একাদশ সংস্করণে (আইসিডি-১১) ‘গেমিং ডিসঅর্ডার’কে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় গেম খেললেই কাউকে এই সমস্যায় আক্রান্ত বলা যায় না। গেম খেলার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো, অন্যান্য কাজের চেয়ে গেমকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং ক্ষতি সত্ত্বেও এ অভ্যাস অব্যাহত রাখার মতো লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব
মস্তিষ্কের রাসায়নিক পরিবর্তন: অতিরিক্ত গেমিংয়ের ফলে মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোনের ক্ষরণ ঘটে, যা মাদকাসক্তির মতোই এক ধরণের তীব্র মানসিক নেশা ও নির্ভরতা তৈরি করে।
উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা: দীর্ঘ সময় গেম খেললে বাস্তব জীবন থেকে দূরত্ব তৈরি হয়, যা তীব্র মানসিক চাপ, সাইবার-উদ্বেগ, ডিপ্রেশন এবং মেজাজ খিটখিটে হওয়ার কারণ হয়ে অতিরিক্ত গেমিংয়ের কারণে। বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও সামাজিক যোগাযোগ অবহেলিত হতে পারে। ঘুমের ঘাটতি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার ফলে মানসিক চাপ বাড়তে পারে। তবে গেমিং ও বিষণ্ণতার সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে একমুখী নয়; মানসিক চাপ বা একাকিত্ব থেকেও কেউ অতিরিক্ত গেমিংয়ে জড়িয়ে পড়তে পারে।
মনোযোগ ও পড়াশোনায় সমস্যা: দীর্ঘ সময় গেম খেললে পড়াশোনা, কাজ কিংবা অন্যান্য দায়িত্বের জন্য সময় কমে যায়। ঘুমের ঘাটতি ও বারবার গেম খেলার তাগিদ মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করতে পারে।
মেজাজের পরিবর্তন: গেম খেলার সময় কমিয়ে দেওয়া বা বন্ধ করতে বললে কারও কারও মধ্যে বিরক্তি, রাগ কিংবা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ একা গেমিং ডিসঅর্ডার প্রমাণ করে না; সামগ্রিক আচরণ ও দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।
শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি
ঘুমের সমস্যা: গভীর রাত পর্যন্ত গেম খেললে ঘুমের সময় কমে যেতে পারে এবং স্বাভাবিক ঘুমের রুটিন ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে দিনের বেলায় ক্লান্তি, ঝিমুনি ও কাজে মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
চোখ ও পেশিতে ব্যথা: দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ শুষ্ক হওয়া, চোখে চাপ, মাথাব্যথা এবং ঝাপসা দেখার মতো সাময়িক সমস্যা হতে পারে। একই ভঙ্গিতে দীর্ঘ সময় বসে থাকলে ঘাড়, পিঠ, কাঁধ ও কবজিতে ব্যথাও দেখা দিতে পারে।
ওজন ও জীবনযাত্রায় প্রভাব: দীর্ঘ সময় বসে গেম খেলার কারণে শারীরিক কার্যক্রম কমে যেতে পারে। পাশাপাশি অনিয়মিত খাবার ও ঘুমের অভ্যাস ওজন এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে প্রভাব
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: গেম খেলার জন্য পরিবার, বন্ধু ও পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় কাটানো কমে যেতে পারে। ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পড়াশোনা ও কর্মজীবনে ক্ষতি: গেমিংয়ের কারণে নিয়মিত পড়াশোনা, পরীক্ষার প্রস্তুতি, অফিসের কাজ কিংবা অন্যান্য দায়িত্ব অবহেলিত হলে ফলাফল ও কর্মদক্ষতা কমতে পারে।
পারিবারিক দ্বন্দ্ব: গেম খেলার সময় নিয়ে বিরোধ, দায়িত্ব পালনে অনীহা, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় কিংবা গেম খেলার সময় গোপন করার প্রবণতা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে।
সম্পর্কের অবনতি: গেমের জন্য পরিবারের মানুষদের সাথে মিথ্যা বলা বা সময় না দেওয়ার কারণে পারিবারিক অশান্তি এবং দাম্পত্য কলহ তৈরি হয়।
গেমিং আসক্তি থেকে মুক্তির উপায়
গেমিংয়ের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমেই প্রতিদিন কতক্ষণ গেম খেলা হচ্ছে, তা হিসাব রাখা প্রয়োজন। এরপর পড়াশোনা, কাজ, ঘুম, ব্যায়াম ও পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে নেওয়া যেতে পারে।
গেম খেলার সময়সীমা নির্ধারণ, ঘুমানোর আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমানো, নিয়মিত খেলাধুলা ও শরীরচর্চা এবং পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো উপকারী হতে পারে। শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচিত শাস্তি বা অপমানের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে নিয়ম তৈরি করা এবং বিকল্প বিনোদনের সুযোগ দেওয়া।
গেম খেলার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়লে, পড়াশোনা বা কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে কিংবা পারিবারিক সম্পর্কে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিনোদনের জন্য গেম খেলা নিজে কোনো মানসিক রোগ নয়। তবে যখন গেমিং দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, সম্পর্ক ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন সচেতন হওয়া জরুরি। সময়মতো অভ্যাস পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়ার মাধ্যমে এর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব।
প্রতিছবি ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।























Comments: