Wednesday 29 July, 2026

For Advertisement

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: কতটা চিন্তার, কতটা স্বাস্থ্যঝুঁকি?

28 July, 2026 5:52:32

দিনে অন্তত দুবার দাঁত ব্রাশ করা সুস্থ মুখগহ্বর ও দাঁত রক্ষায় সবচেয়ে পরিচিত এবং প্রয়োজনীয় অভ্যাসগুলোর একটি। সুস্থ দাঁত ও মাড়ির জন্য টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, ডেন্টাল ফ্লস কিংবা প্রয়োজন হলে ডেন্টিস্টের পরামর্শ—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মুখের পরিচর্যায় ব্যবহৃত এসব পণ্য থেকেই অজান্তেই পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, যার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেও পৌঁছে যেতে পারে।

এই উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও) এক বছরের গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ১৯টি দেশি ও বিদেশি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করে ২৬টিতে, অর্থাৎ ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছে।

কীভাবে আসে মাইক্রোপ্লাস্টিক?

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পাঁচ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণা। ভেঙে যাওয়া প্লাস্টিক, কৃত্রিম তন্তু কিংবা শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বিভিন্ন প্লাস্টিক উপাদান থেকে এগুলো তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, টুথপেস্টে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা, প্লাস্টিকভিত্তিক ডেন্টাল ফ্লসের তন্তু এবং প্লাস্টিকের টুথব্রাশের ব্রিসল নিয়মিত ব্যবহারে ক্ষয়ে গিয়ে পানির সঙ্গে মিশে যায়। এরপর তা বর্জ্যপানির মাধ্যমে নদী, সমুদ্র ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে।

অনেক দেশে টুথপেস্টে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড নিষিদ্ধ হলেও গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক কিছু টুথপেস্টেও অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা রয়ে গেছে।

শুধু টুথপেস্ট নয়, ডেন্টাল চিকিৎসাও একটি উৎস

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাঁতের সাদা রঙের কম্পোজিট ফিলিং, অ্যাক্রিলিক ডেন্টাল, ক্লিয়ার অ্যালাইনার, রিটেইনার, মাউথগার্ডসহ বিভিন্ন ডেন্টাল সামগ্রীও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ছাড়ে। ব্রিটিশ ডেন্টাল জার্নাল-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রেজিনভিত্তিক কম্পোজিট ফিলিং থেকে ক্ষুদ্র রেজিন কণা ও রাসায়নিক লালা এবং বর্জ্যপানিতে মিশতে পারে। দাঁতের ড্রিলিং বা পালিশের সময়ও সূক্ষ্ম প্লাস্টিক ধুলা তৈরি হয়, যা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।

শরীরে কীভাবে ঢোকে?

মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু পরিবেশেই নয়, মানুষের শরীরেও পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের রক্ত, ধমনির প্লাক, প্লাসেন্টা, ফুসফুস, এমনকি মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত আট বছরে মানুষের মস্তিষ্কে জমা হওয়া প্লাস্টিক কণার পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। গবেষকদের মতে, পৃথিবীতে প্লাস্টিকের ব্যবহার দ্রুত বেড়ে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমরা খাবার, পানীয়, বাতাস এবং দূষিত পরিবেশের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করি। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেও এটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তবে বিভিন্ন গবেষণায় এর সঙ্গে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, হৃদরোগ, স্ট্রোক, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, প্রদাহ এবং বিষাক্ত রাসায়নিক রক্তে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

অনেক রেজিনভিত্তিক ডেন্টাল ফিলিংয়ে বিসফেনল-এ (বিপিএ) নামের রাসায়নিক থাকে, যা হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। আরো একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ধমনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, তাদের হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল।

এছাড়া, একটি গবেষণায় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে অন্যদের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। তবে গবেষকেরা বলছেন, এসব বিষয়ে আরো বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের গবেষণায় যা পাওয়া গেছে

গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি কণা পাওয়া গেছে মেডিপ্লাস ফ্লুরাইড জেল-এ—প্রতি ১০০ গ্রামে ৩২০টি। এছাড়া, ক্লোজআপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেনথল ফ্রেশে ১৬০টি, কোডোমো আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলায় ১৪০টি, সিগন্যাল গ্রিন টি-তে ১২০টি, পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট ও হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ারে ১০০টি এবং সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্টে ৮০টি কণা পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, জেনফ্রেশ, প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো) এবং ক্লোজআপ রেড-হট জিংক ফ্রেশ টেকনোলজিসহ আটটি নমুনায় কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। শিশুদের জন্য পরীক্ষিত ছয়টি টুথপেস্টের চারটিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল কোডোমো আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলায়।

সচেতনতা এখনো কম

গবেষণার অংশ হিসেবে ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর একটি জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষয়টি আগে কখনও শোনেননি। ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ শব্দটি শুনলেও এ বিষয়ে তেমন জানতেন না। মাত্র ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে টুথপেস্টের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ডে ৪০টি অনুমোদিত উপাদান ও কণার আকার নির্ধারণ করা আছে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান কম খরচে ওজন বাড়াতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সংস্থাটি টুথপেস্টের মানদণ্ডেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। অন্যদিকে, ইউনিলিভার বাংলাদেশ জানিয়েছে, তাদের সব টুথপেস্ট আন্তর্জাতিক মান ও স্থানীয় বিধিমালা মেনেই তৈরি করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদনের পদ্ধতি ও ফলাফল সম্পর্কে তারা আরও তথ্য সংগ্রহ করছে।

ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?

নতুন এই গবেষণা শুধু দেশের ভোক্তাদেরই নয়, বিশ্বজুড়ে দৈনন্দিন মুখের পরিচর্যার পণ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতন কিছু অভ্যাস গড়ে তুললে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা এখন কঠিন। তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
• প্লাস্টিকের বদলে বাঁশ বা প্রাকৃতিক তন্তুর টুথব্রাশ ব্যবহার করুন।
• প্লাস্টিকমুক্ত বা সিল্কের ডেন্টাল ফ্লস বেছে নিন।
• পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ে টুথপেস্ট ট্যাবলেট বা পাউডার ব্যবহার করতে পারেন।
• খাবার সংরক্ষণে প্লাস্টিকের বদলে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করুন।
• প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ড, পুরোনো ননস্টিক প্যান ও প্লাস্টিকের রান্নার সরঞ্জাম যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
• বোতলজাত পানির বদলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ বা স্টিলের বোতল ব্যবহার করুন।
• তুলা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক ব্যবহারে গুরুত্ব দিন এবং অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ডেন্টাল প্রযুক্তি মুখের যত্নকে আরো নিরাপদ ও সহজ করেছে। তবে এর সম্ভাব্য পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন সমুদ্র থেকে মানুষের রক্তপ্রবাহ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তাই সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোই হতে পারে নিজের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার অন্যতম কার্যকর উপায়।

*টাইমস অব ইন্ডিয়া, হেলথ ডটকম, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অবলম্বনে

For Advertisement

সম্পাদক ও প্রকাশক:- এ এফ এম রিজাউর রহমান (রুমেল), এডভোকেট- বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
  • সহযোগী-সম্পাদক: হাসিনা রহমান শিপন
  • সহ -সম্পাদক: রাশিকুর রহমান রিফাত
  • নিউজ রুম ইনচার্জ : তাসফিয়া রহমান সিনথিয়া
© সকল স্বত্ব প্রতিচ্ছবি ডটকম ২০১৫ - ২০২২ অফিস: ৭২/২ উত্তর মুগদাপাড়া, ঢাকা ই-মেইল: dailyprotichhobi@gmail.com | মোবাইল: ০১৮১৮০৯৩১৩৭ ফোন:+৮৮০২৭২৭৭১৪৭

Developed by WebsXplore