For Advertisement
হাদিস অস্বীকার থেকে সাবধান
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক মহল থেকে হাদিস অস্বীকার করার মতো চরম দুঃসাহস লক্ষ করা যাচ্ছে। একশ্রেণির লোক নিজেদের ‘আহলে কুরআন’ দাবি করে কুরআন মানার কথা বললেও হাদিসকে অস্বীকার করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হাদিসবিরোধী প্রচারণায় নেমেছে। তারা কখনো সরাসরি হাদিস অস্বীকার না করলেও হাদিস বর্ণনাকারী রাবি, মুহাদ্দিস ও ইমামদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে ইমাম বুখারি (রহ.)-এর মতো মহান মুহাদ্দিস সম্পর্কে ‘তিনি হাদিস বানাতেন’ এমন অবান্তর ও ভয়ংকর অভিযোগও তোলা হচ্ছে। অথচ এটি শুধু একজন ইমামের বিরুদ্ধে অপবাদ নয়; বরং রাসূল (সা.)-এর হাদিস অস্বীকারেরই নতুন কৌশল।
রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা তা আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হলো আল্লাহর কিতাব এবং অপরটি তার নবীর সুন্নাহ।’-(মুয়াত্তা মালেক : ১৬৬১)।
এ কথা কারও অজানা নয়, রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ সংরক্ষিত হয়েছে হাদিসের মাধ্যমে। আর এই হাদিসগুলো সংরক্ষণ ও সংকলন করেছেন মুহাদ্দিস ইমামরা। তাদের মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থ হলো ‘সহিহ বুখারি’, যা কুরআনের পর সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসাবে উম্মাহর কাছে স্বীকৃত।
‘হাদিস’ শব্দটি আরবি। এর অর্থ কথা, বাণী, সংবাদ, আলোচনা, কাহিনি, নতুন তথ্য ইত্যাদি। সহজভাবে বলতে গেলে, রাসূল (সা.)-এর কথা, কাজ, অনুমোদন ও জীবনবিধানই হাদিস। এগুলো শুধু ঐতিহাসিক তথ্য নয়; বরং ওহিরই অংশ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। এটি তো ওহি, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়।’-(সূরা নাজম : ৩-৪)। অর্থাৎ, রাসূল (সা.)-এর দীনসংক্রান্ত বক্তব্য আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশনারই অংশ, যাকে বলা হয় ‘ওহিয়ে গাইরে মাতলু’।
সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে তাবেয়িন এবং পরবর্তী মুহাদ্দিসরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হাদিস সংরক্ষণ করেছেন। আরবদের স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। তারা মুখস্থ রাখতেন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নির্ভুলভাবে পৌঁছে দিতেন। পাশাপাশি বিভিন্ন উপকরণে হাদিস লিখেও সংরক্ষণ করা হতো।
পরবর্তী সময়ে মুহাদ্দিসরা ‘ইলমে রিজাল’, ‘জারহ ও তাদিল’সহ কঠোর নীতিমালার মাধ্যমে প্রতিটি রাবির জীবন যাচাই করেছেন। একজন রাবির চরিত্র, তাকওয়া, স্মৃতিশক্তি, আমানতদারি, আকিদা সবকিছু বিচার করেই হাদিস গ্রহণ করা হয়েছে।
হাদিস শাস্ত্রের সম্রাট, ‘আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস’ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারি (রহ.) তার সংকলিত প্রতিটি হাদিস সনদসহ উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজ থেকে কোনো কথা রাসূল (সা.)-এর নামে চালিয়ে দেননি। হাদিস সংকলনের আগে তিনি গোসল করতেন, দুই রাকাত নফল নামাজ পড়তেন, ইস্তিখারা করতেন, এরপর হাদিস লিখতেন। এ বিষয়গুলো হাদিস শাস্ত্রের কিতাবগুলো উল্লেখ রয়েছে।
আল্লামা কিরমানি (রহ.) বলেন, ইমাম বুখারি (রহ.) ১০৮০ জন মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ করেছেন। তার মুখস্থ ছিল প্রায় ছয় লাখ হাদিস। দীর্ঘ ১৬ বছরের সাধনার পর তিনি ‘সহিহ বুখারি’ সংকলন করেন।
সহিহ বুখারির প্রথম হাদিস, ‘নিশ্চয়ই সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ এ হাদিসটি ইমাম বুখারি (রহ.) বিভিন্ন সনদে মোট সাতবার উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, সহিহ মুসলিম, মুসনাদে আহমদসহ আরও বহু হাদিসগ্রন্থেও এটি এসেছে।
অর্থাৎ, ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল, ভিন্ন ভিন্ন ওস্তাদ ও রাবির মাধ্যমে একই হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তাহলে কীভাবে বলা যায়, সবাই মিলে হাদিস বানিয়েছেন?
ইমাম বুখারি (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন উজবেকিস্তানের বুখারায়। ইমাম মুসলিম (রহ.) নিশাপুরে। ইমাম তিরমিজি (রহ.) তিরমিজে। ইমাম আবু দাউদ (রহ.) সিজিস্তানে। ইমাম মালেক (রহ.) মদিনায়। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বাগদাদে। তাদের জন্ম-মৃত্যু, অঞ্চল ও যুগ ভিন্ন ছিল। অনেকে একে অপরের সাক্ষাৎও পাননি। তাহলে এত ভিন্ন অঞ্চলের মানুষ কীভাবে একই ধরনের মিথ্যা তৈরি করে শত শত বছর ধরে সংরক্ষণ করলেন? বরং এটি প্রমাণ করে হাদিস ছিল সুসংরক্ষিত, নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য।
বর্তমানে সরাসরি হাদিস অস্বীকার না করে, মুহাদ্দিসদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আজ ইমাম বুখারি (রহ.)-কে টার্গেট করা হচ্ছে, কাল ইমাম মুসলিম (রহ.)-কে করা হবে, এরপর অন্যদের। মূল উদ্দেশ্য একটাই, রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহকে মানুষের জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া। অতীতেও মুতাযিলা ও বিভিন্ন বাতিল ফেরকা এ কাজ করেছে। আজও নতুন নামে, নতুন কৌশলে তারা সক্রিয়।
কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি দুর্বল, তা শিখতে হবে যোগ্য আলেমদের কাছ থেকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অজ্ঞ লোকদের বক্তব্য শুনে হাদিস সম্পর্কে সন্দেহে পতিত হওয়া বিপজ্জনক।
বাস্তবতা হলো, হাদিস সংরক্ষণে মুসলিম উম্মাহ এমন কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করেছে, যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যে বিরল। হাজারো রাবি, শত শত মুহাদ্দিস, অসংখ্য সনদ ও দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে হাদিস সংরক্ষিত হয়েছে।
অতএব, আমাদের উচিত, কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা, সহিহ হাদিসের প্রতি আস্থা রাখা এবং হাদিসবিদ্বেষী অপপ্রচার থেকে ইমান ও সমাজকে রক্ষা করা।
লেখক : খতিব
Latest
For Advertisement
- সহযোগী-সম্পাদক: হাসিনা রহমান শিপন
- সহ -সম্পাদক: রাশিকুর রহমান রিফাত
- নিউজ রুম ইনচার্জ : তাসফিয়া রহমান সিনথিয়া
Developed by WebsXplore