For Advertisement
সরকারকে চাপে রাখতে রাজপথে বড় আন্দোলনের প্রস্তুতি ১১ দলের
রাজধানী থেকে চট্টগ্রাম ও রংপুরের পর ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়ায় লংমার্চ করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। সাত দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে বিভিন্ন স্থানে পথসভা ও সমাপনী জনসভার মধ্য দিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি তুলে ধরেছে জোটটি। তবে, কুষ্টিয়ার সমাপনী জনসভায় শুধু দাবি আদায়ের আহ্বানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি নেতারা; দিয়েছেন আন্দোলন আরো জোরদারের বার্তাও।
সাত দাবি বাস্তবায়ন না হলে এক দফার আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। প্রয়োজনে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় গিয়ে আন্দোলনে অংশ নিতে নেতাকর্মীরা প্রস্তুত কি না, সেই প্রশ্নও রাখেন তিনি। একই জনসভায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও ঢাকামুখী আন্দোলনের জন্য নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
এমন পরিস্থিতিতে লংমার্চের পর ১১ দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক কর্মসূচি কোন দিকে এগোচ্ছে, তা নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। জোটটির সামনে এখন একদিকে সিলেটসহ বাকি বিভাগগুলোতে কর্মসূচি বাস্তবায়ন, অন্যদিকে ঢাকায় মহাসমাবেশের মাধ্যমে আন্দোলনকে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার পরিকল্পনা। দাবি আদায়ে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করাই আপাতত তাদের ঘোষিত লক্ষ্য। তবে, নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, দাবি পূরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে আন্দোলনের ধরন ও কর্মসূচি আরো কঠোর করার চিন্তাও রয়েছে।
গত ৩১ অক্টোবর শনিবার রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ১১ দলীয় ঐক্যের খুলনা বিভাগ অভিমুখী লংমার্চ। সকাল ৭টায় উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গাড়িবহর ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে যাত্রা করে। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক, পদ্মা সেতু, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, খুলনা, রূপসা সেতু, যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে বহরটি কুষ্টিয়ায় পৌঁছায়। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।
কুষ্টিয়ায় শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে লংমার্চের সমাপনী জনসভায় জামায়াতের ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “একটা দাবিও আমাদের কোনো দলীয় দাবি না। সবকটি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। সাত দফা যদি মেনে নেন, এক দফা দাবির প্রয়োজন হবে না; কিন্তু সাত দফা না মানলে এক দফা অনিবার্য হয়ে উঠবে। সেই এক দফার ডাক আমরা দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, অধিকার রক্ষার স্বার্থে দিতে বাধ্য হব।”
সংসদে সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। তিনি জানান, জনগণের ভোটে গঠিত সংসদের পাশাপাশি একটি সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রত্যাশা ছিল তাদের। সংসদে বসেই ওই পরিষদ রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে এমনটাই তারা চেয়েছিলেন। তবে, নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, এ কারণে সরকার ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। জনগণের রায় উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করা হলে ইতিহাসে সংশ্লিষ্টদের করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান।
সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে জামায়াত আমির জানতে চান, এক দফার আন্দোলনের প্রয়োজনে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় যেতে হলে তারা প্রস্তুত কি না। অর্থ কিংবা খাবারের ব্যবস্থা না থাকলেও জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তার এই বক্তব্যে সাত দাবি আদায়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং প্রয়োজনে ঢাকামুখী আন্দোলনে যাওয়ার প্রস্তুতির বিষয়টি উঠে আসে।
জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিএনপির বিরুদ্ধে জনগণের সঙ্গে ওয়াদা ভঙ্গ, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, “আমরা চাইনি এই আট মাসের মধ্যে আন্দোলনে আসতে হবে। কিন্তু, কেন আসতে হলো, সেটা বিএনপির নেতারা বোঝেন না। আপনারা আট মাস না যেতেই জনগণের ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারেন, গাদ্দারি করতে পারেন, দুর্নীতি ও লুটপাট করে সব শেষ করে দিচ্ছেন।”
সচিবালয় থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “সারের একেকটি ডিলারশিপ দিতে ১২ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছেন।”
সমাপনী জনসভায় শরিক দলগুলোর নেতারাও সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আন্দোলন জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “বাংলাদেশকে অন্য কোনো রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হতে দেওয়া হবে না। সাত দাবি পূরণে সরকারের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পেলে যেকোনো সময় তা এক দফায় রূপ নিতে পারে।” এক দফার কর্মসূচি এলে ঢাকামুখী আন্দোলনে অংশ নিতে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জোটটির ধারাবাহিক লংমার্চের কেন্দ্রীয় বিষয় সাত দফা দাবি। এর মধ্যে রয়েছে- গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ করা।
তবে, শুরু থেকেই দাবির সংখ্যা সাত ছিল না। গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রথম লংমার্চের সময় জোটের ছয় দফা দাবি ছিল। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধের দাবিটি যুক্ত হয়ে সাত দফা পূর্ণতা পায়। এরপর গত ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চে জাতীয় দাবির পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো আঞ্চলিক বিষয়ও গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ, জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় সমস্যা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে ১১ দলীয় জোট।
রাজনৈতিকভাবে এ কৌশলের তাৎপর্য রয়েছে। শুধু জাতীয় পর্যায়ের রাষ্ট্র সংস্কার কিংবা রাজনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে আঞ্চলিক সমস্যা সামনে আনলে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে কর্মসূচির সংযোগ তৈরির সুযোগ বাড়ে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে শরিক দলগুলোর সাংগঠনিক উপস্থিতি দৃশ্যমান করার ক্ষেত্রও তৈরি হয়। তবে, কোনো কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন এক বিষয় নয়। আন্দোলনের প্রকৃত জনসম্পৃক্ততা কতটা বাড়ছে, তা বোঝার জন্য পরবর্তী কর্মসূচিগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
খুলনা বিভাগের কর্মসূচি শেষ হলেও ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ এখানেই থামছে না। পরবর্তী গন্তব্য সিলেট। জোটটির পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। সিলেট বিভাগের সড়ক যোগাযোগের বেহাল অবস্থার কারণে শুরুতে ট্রেনযোগে লংমার্চ করার চিন্তা করা হয়েছিল। রেলস্টেশনের কাছাকাছি এলাকায় পথসভা আয়োজনের প্রস্তাবও রয়েছে। তবে, কর্মসূচির কারণে সাধারণ যাত্রীদের ট্রেন চলাচলে কোনো বিঘ্ন তৈরি হবে কি না, তা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, “সিলেট অভিমুখে আমাদের আরো একটি লংমার্চ করার কথা রয়েছে। এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশ হবে। আমাদের প্রত্যাশা, লংমার্চগুলো শেষ হলে দেশবাসীও লংমার্চ করে ঢাকায় আসবে। এর মধ্যে বিএনপি সরকার নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে সঠিক পথে ফিরে আসবে এবং গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করবে বলে আমরা আশা করি। অন্যথায় আমাদের এক দফার আন্দোলনে যেতে হবে।”
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “সিলেট বিভাগের সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে ট্রেনপথে কর্মসূচির চিন্তা করা হয়েছিল। তবে, সাধারণ যাত্রী পরিবহনে কোনো জটিলতা তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা করে শীর্ষ নেতারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। ফলে নির্ধারিত তারিখে কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হলেও সেটি সড়কপথে নাকি রেলপথে হবে, তা এখনো আলোচনার বিষয়।”
এদিকে, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগেও লংমার্চ আয়োজনের প্রস্তাব এসেছে স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে। বিষয়টি নিয়ে জোটের লিয়াজোঁ কমিটি ও শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তবে, এ দুই বিভাগে কর্মসূচি আয়োজনের তারিখ কিংবা ধরন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার সুযোগ পাবে ১১ দলীয় ঐক্য। পাশাপাশি সাত দফা দাবিকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক পর্যায়ে সমর্থন ও সাংগঠনিক সমন্বয় তৈরির চেষ্টাও জোরদার হবে।
বিভাগভিত্তিক লংমার্চের পাশাপাশি ঢাকায় মহাসমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে জোটটির। এর আগে ঘোষিত কর্মসূচিতে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা জানানো হয়েছিল। তবে, পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে কর্মসূচিটি পিছিয়ে ডিসেম্বরে নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে। এখন পর্যন্ত মহাসমাবেশের চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। বিভাগভিত্তিক কর্মসূচি শেষ করে রাজধানীর মহাসমাবেশ থেকে পরবর্তী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
জোটটির কর্মপরিকল্পনায় ঢাকার মহাসমাবেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ বিভাগভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে দাবি তুলে ধরার পর রাজধানীতে বড় জমায়েতের মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের এক মঞ্চে এনে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের রূপরেখা নির্ধারণ করা সম্ভব। এ কারণে মহাসমাবেশের তারিখ ও কর্মসূচির ধরন নিয়ে জোটের পরবর্তী সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
ধারাবাহিক লংমার্চের মাধ্যমে ১১ দলীয় ঐক্য মূলত সাত দাবিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া, শরিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সমন্বয় দৃশ্যমান করা এবং সরকারের ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের জন্য শুধু বড় গাড়িবহর কিংবা সমাপনী জনসভায় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমর্থন, শরিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য এবং ধারাবাহিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা।
এ ক্ষেত্রে ১১ দলীয় ঐক্যের সামনে কয়েকটি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সাত দফা দাবির সবগুলোকে একই গুরুত্বে সামনে রাখা, বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় ইস্যুকে জাতীয় দাবির সঙ্গে সমন্বয় করা এবং শরিক দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা সহজ হবে না। বিশেষ করে সাত দফা থেকে এক দফার আন্দোলনে যাওয়ার মতো কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হলে জোটের অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য, কর্মসূচির স্পষ্টতা এবং জনসম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, সরকারের প্রতিক্রিয়াও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। সাত দাবির বিষয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, রাজনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি হয় কি না কিংবা দাবিগুলো উপেক্ষিত থাকে কি না এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই জোটের পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
তবে কুষ্টিয়ার সমাপনী জনসভা ১১ দলীয় ঐক্যের আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। এতদিন বিভাগভিত্তিক লংমার্চ ও সাত দফা দাবি সামনে থাকলেও এবার প্রকাশ্যে এসেছে এক দফার আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি। নেতাদের বক্তব্যে ঢাকামুখী কর্মসূচির প্রস্তুতির কথাও উঠে এসেছে। তবে এখনই বড় আন্দোলনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, এমনটি বলার সুযোগ নেই। বরং ধারাবাহিক বিভাগীয় কর্মসূচি, সম্ভাব্য মহাসমাবেশ এবং সরকারের অবস্থান বিবেচনায় নিয়েই আন্দোলনের পরবর্তী পথ নির্ধারণ করতে চাইছে জোটটি।
১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক দল এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “লংমার্চ দাবি আদায়ের পাশাপাশি গণসংযোগ ও সাংগঠনিক গতি তৈরির একটি ভালো কর্মসূচি বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। যেহেতু, সাত দাবির বেশিরভাগই জনগণের দৈনন্দিন জীবন যাত্রার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তাই জনগণের আগ্রহ এবং স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষ হ্যা-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে, সুতরাং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবির প্রতি স্বাভাবিকভাবেই তাদের একটা আন্তরিক আবেগ আছে।”
তিনি বলেন, “সংসদ যেহেতু কার্যকর আছে, সেহেতু সংসদ ও সংসদের বাইরে সরকারকে সমন্বিত চাপে রাখতে আন্দোলন কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে। যদি সরকার সংসদকে অকার্যকর করে ফেলে তাহলে রাজপথে চূড়ান্ত চাপ সৃষ্টির জন্য আন্দোলন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে লংমার্চের মতো কর্মসূচি আয়োজনের পরিবেশ তৈরি করাটাই কঠিন। এটি এক অর্থে রাজনৈতিক দুর্বলতারও প্রকাশ। তবে লংমার্চ থেকে সরাসরি সরকার পতনের প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশে সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। বিএনপির কিছু জনপ্রিয়তা হয়তো কমেছে, কিন্তু এমন অবস্থা তৈরি হয়নি যে চাইলেই বড় আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব।”
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, “আমাদের প্রথম লংমার্চ ছিল চট্টগ্রাম অভিমুখে। সেখানে দেশবাসীর কাছ থেকে যে সাড়া পেয়েছি, দ্বিতীয় লংমার্চে রংপুর অভিমুখে তার চেয়ে অনেক বেশি সাড়া পেয়েছি। খুলনা ও কুষ্টিয়ায় তৃতীয় কর্মসূচিতে মানুষের সম্পৃক্ততা, ভালোবাসা, দোয়া ও সমর্থন আরো বেড়েছে। প্রতিটি লংমার্চের পর আমরা আগের চেয়ে বেশি জনসমর্থন পাচ্ছি। এ থেকে বোঝা যায়, বর্তমান সরকারের আট মাসের শাসনে জনগণ ত্যক্ত-বিরক্ত। তারা এক দফার অপেক্ষায় রয়েছে। বিরোধীদলের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং সরকার পতনের এক দফা কর্মসূচি ঘোষণার দাবি বিভিন্ন জায়গা থেকে আমরা পাচ্ছি।”
পরবর্তী কর্মসূচি প্রসঙ্গে রাশেদ প্রধান বলেন, “সিলেট অভিমুখে আমাদের আরো একটি লংমার্চ করার কথা রয়েছে। এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশ হবে। আমাদের প্রত্যাশা, লংমার্চগুলো শেষ হলে দেশবাসীও লংমার্চ করে ঢাকায় আসবে। এর মধ্যে বিএনপি সরকার নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে সঠিক পথে ফিরে আসবে এবং গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করবে বলে আমরা আশা করি। অন্যথায় আমাদের এক দফার আন্দোলনে যেতে হবে।”
লংমার্চের উদ্দেশ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “লংমার্চ সরকারকে চাপে রাখার জন্য করা হচ্ছে এমন ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই। আমরা ১১ দল বা জামায়াতের কোনো দলীয় দাবি নিয়ে রাজপথে নামিনি; নেমেছি জনগণের দাবি নিয়ে। সরকারকে চাপে ফেলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং জনগণের ন্যায্য অধিকার ও দাবির বিষয়টি সরকারের কাছে তুলে ধরা। সরকার যদি জনগণের ন্যায্য দাবি পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে সর্বস্তরের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নামতে হবে।”
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের দাবি ও প্রত্যাশার কথা সরকারের কাছে তুলে ধরা। চট্টগ্রাম, রংপুর এবং সর্বশেষ খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও সাড়া আমরা লক্ষ্য করেছি। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সাত দফা দাবির বিষয়ে জনমত তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা চাই, সরকার জনগণের প্রত্যাশা ও গণভোটের রায়কে গুরুত্ব দিয়ে দাবিগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিক।”
তিনি বলেন, “আমাদের পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে সিলেট অভিমুখে লংমার্চের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশ আয়োজনের বিষয়টিও বিবেচনায় আছে। তবে, এসব কর্মসূচির তারিখ, ধরন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ জোটের শীর্ষ নেতারা আলোচনা করে নির্ধারণ করবেন।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে লংমার্চের মতো কর্মসূচি আয়োজনের পরিবেশ তৈরি করাটাই কঠিন। এটি এক অর্থে রাজনৈতিক দুর্বলতারও প্রকাশ। তবে লংমার্চ থেকে সরাসরি সরকার পতনের প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশে সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। বিএনপির কিছু জনপ্রিয়তা হয়তো কমেছে, কিন্তু এমন অবস্থা তৈরি হয়নি যে চাইলেই বড় আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব।”
তিনি বলেন, “এক দফার কথা বলা সহজ, কিন্তু এর পরিণতি কী হতে পারে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। আন্দোলনের বিষয়ে দু-একজন নেতা যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন, তারা যদি সত্যিই সেসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে এগিয়ে যান, তাহলে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয় পক্ষকেই সংযম প্রদর্শন এবং সমঝোতায় আসার জন্য আমরা বিনীত অনুরোধ জানাব।”
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ সরকারের ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, “এই কর্মসূচি সরকারকে কিছুটা চাপে ফেলবে। জনসাধারণের মধ্যে সরকারের কিছু সীমাবদ্ধতা, ব্যর্থতা ও অসন্তোষ রয়েছে। লংমার্চের মতো কর্মসূচি সেই অসন্তোষকে সামনে নিয়ে আসবে এবং সরকারকে প্রভাবিত করবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, এর ফলে সরকারের পতন হয়ে যাবে কিংবা সরকার বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়বে।”
সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব এবং পাল্টাপাল্টি গোপন সমঝোতার অভিযোগের বিষয়ে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “সরকারি দল বলছে, বিরোধী দলের সঙ্গে তাদের গোপন চুক্তি হয়েছে। আবার বিরোধী দলও পাল্টা অভিযোগ করছে। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি দোষারোপের রাজনীতি দেশের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য এবং সুশাসনের জন্য ভালো নয়। আমরা এমন পরিস্থিতি প্রত্যাশা করি না। রাজনৈতিক বিরোধের সুযোগ নিয়ে কোনো তৃতীয় শক্তি যেন নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে না পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।”
ডিসেম্বরের মধ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের বড় সমাবেশ আয়োজনের সম্ভাবনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা নিয়ে তিনি বলেন, “তৃতীয় কোনো শক্তির সঙ্গে এ ধরনের যোগসাজশ বা সহযোগিতার বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত। দেশের মানুষ এমন পরিস্থিতি গ্রহণ করে না। ডিসেম্বরের মধ্যে বড় সমাবেশ হলে তা সরকারকে প্রভাবিত করতে পারে, সরকারের ওপর চাপও তৈরি করতে পারে। কিন্তু শুধু এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটবে এমনটা মনে করার কারণ নেই।”সূত্রঃ রাইজিং বিডি ডট কম
Latest
For Advertisement
- সহযোগী-সম্পাদক: হাসিনা রহমান শিপন
- সহ -সম্পাদক: রাশিকুর রহমান রিফাত
- নিউজ রুম ইনচার্জ : তাসফিয়া রহমান সিনথিয়া
Developed by WebsXplore