পেটের চর্বি কি পুরুষের যৌনক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে?

28 October 2026, 9:24:18

পেটের মেদ বা ভুঁড়িকে অনেক সময় স্বচ্ছলতার প্রতীক হিসেবে মজা করে দেখা হয়। তবে পেটের ভেতরে অতিরিক্ত চর্বি জমা পুরুষের হরমোনের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোন কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে বয়সের চেয়ে শরীরে, বিশেষ করে পেটের গভীরে, জমে থাকা চর্বির ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

জার্নাল অব দ্য এন্ডোক্রাইন সোসাইটি-তে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমলেও এই পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরে চর্বি জমার ধরন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। সাধারণত ৩৫ বছর বয়সের পর পুরুষদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করতে পারে। তবে বয়সই যে এর প্রধান কারণ, এমন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে নতুন এই বিশ্লেষণ।

পেটের গভীরের চর্বিই কেন উদ্বেগের?

ভিসেরাল ফ্যাট বা অন্তঃপেটীয় চর্বি হলো পেটের ভেতরে লিভার, পাকস্থলী ও অন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের চারপাশে জমে থাকা চর্বি। এই চর্বি শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়া এবং হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষকদের মতে, টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমার সঙ্গে এই চর্বির সম্পর্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০ থেকে ৫৯ বছর বয়সি প্রায় পাঁচ হাজার পুরুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ভিসেরাল ফ্যাটের সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার শক্তিশালী সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। তাদের পর্যবেক্ষণে, এই বয়সসীমার মধ্যে হরমোনের মাত্রার সঙ্গে বয়সের সম্পর্কের তুলনায় পেটের গভীরে জমে থাকা চর্বির সম্পর্ক বেশি স্পষ্ট ছিল।

গবেষণা পর্যালোচনার লেখক কার্ল ফ্রিডল ও অ্যাডাম পটারের মতে, পুরুষদের টেস্টোস্টেরন কম থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ভিসেরাল ফ্যাটকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আগের গবেষণাতেও মিলেছে একই ইঙ্গিত

এর আগের কয়েকটি গবেষণাতেও শরীরের অতিরিক্ত চর্বি এবং টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০০৭ সালে ১ হাজার ৬৬৭ জন পুরুষের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই চার থেকে পাঁচ পয়েন্ট বাড়ার সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমার সম্পর্ক রয়েছে। এই পরিবর্তনকে প্রায় ১০ বছর বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রভাবের তুলনায় ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।

২০১৩ সালের আরেকটি গবেষণায় ১ হাজার ৩৮২ জন পুরুষকে পাঁচ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমার ক্ষেত্রে বয়সের পাশাপাশি ধূমপান, স্থূলতা, বিষণ্নতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ বয়স বাড়লেই টেস্টোস্টেরন কমবে, এমনটা অনিবার্য নয়।

শুধু ওজন বা বিএমআই দিয়ে কি ঝুঁকি বোঝা যায়?

শরীরের ওজন, বিএমআই ও কোমরের মাপ দিয়ে স্থূলতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও, এসব মাপ দিয়ে শরীরে চর্বি কোথায় জমেছে তা সব সময় বোঝা যায় না। একই বিএমআই বা কোমরের মাপ থাকা দুই পুরুষের শরীরে ভিসেরাল ফ্যাটের পরিমাণ এবং টেস্টোস্টেরনের মাত্রা আলাদা হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তির ওজন স্বাভাবিক সীমায় থাকলেও তার পেটের গভীরে তুলনামূলক বেশি চর্বি জমতে পারে। আবার বেশি বয়সি ও পেশিবহুল কোনো পুরুষের বিএমআই বেশি হলেও তার ভিসেরাল ফ্যাটের পরিমাণ কম হতে পারে। তাই হরমোনের স্বাস্থ্য মূল্যায়নে শুধু বয়স বা ওজন নয়, শরীরের চর্বির বণ্টনও বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কীভাবে পেটের চর্বি টেস্টোস্টেরন কমাতে পারে?

ভিসেরাল ফ্যাট কীভাবে টেস্টোস্টেরনের মাত্রাকে প্রভাবিত করে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে গবেষকরা কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

পেটের গভীরে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিন প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এতে অণ্ডকোষের টেস্টোস্টেরন উৎপাদনকারী কোষগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া ভিসেরাল ফ্যাট শরীরে প্রদাহজনিত প্রক্রিয়া বাড়াতে এবং হরমোনের সংকেত আদান-প্রদানে প্রভাব ফেলতে পারে। টেস্টোস্টেরন থেকে ইস্ট্রাডিওল তৈরির প্রক্রিয়াতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

করণীয় কী?

গবেষকদের মতে, টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার সমস্যা মূল্যায়নের সময় শরীরের অতিরিক্ত চর্বি এবং অন্যান্য পরিবর্তনযোগ্য বিপাকীয় ঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণ পেটের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

কিছু ওষুধ ওজন কমাতে সাহায্য করলেও, সেগুলো সবার জন্য উপযুক্ত নয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়। একইভাবে, টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপিও সবার প্রয়োজন হয় না। হরমোনের ঘাটতি সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে যথাযথ পরীক্ষা করানো জরুরি।

তবে মনে রাখতে হবে, এই গবেষণায় পেটের গভীরের চর্বি ও টেস্টোস্টেরনের মাত্রার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে; শুধু ভুঁড়ি থাকলেই কারও যৌনক্ষমতা কমে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় না। যৌনস্বাস্থ্য ও হরমোনের ওপর একাধিক বিষয় প্রভাব ফেলে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো পদক্ষেপ।

প্রতিছবি ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।