রাত জেগে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখছেন, এই নিয়মগুলো না মানলে ঘটতে পারে স্বাস্থ্যের বিপত্তি

18 June 2026, 5:52:57

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর রোমাঞ্চকর ম্যাচগুলো সরাসরি দেখতে দেশের লাখ লাখ ফুটবল ভক্তকে রাত জাগতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচ আয়োজক দেশগুলোর সময়ের ব্যবধান থাকায় ভক্তরা প্রিয় দলের খেলা মিস না করতে ঘুমের সময় কোরবানি দিতে প্রস্তুত ফুটবলপ্রেমীরা। তবে মাসব্যাপী এই ফুটবল টুর্নামেন্টের উত্তেজনা উপভোগ করার পাশাপাশি নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা না করারও পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার রাত জাগা, অপর্যাপ্ত ঘুম, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে—বিশেষ করে যারা ইতোমধ্যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন।

মস্তিষ্ক সচল রাখা, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং মেজাজ ঠিক রাখতে ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঝে মাঝে কম ঘুমালে বড় সমস্যা না হলেও, নিয়মিত রাত জাগলে ক্লান্তি, খিটখিটে মেজাজ এবং কাজে মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে।

রাত জাগার মাঝেও যেভাবে ঘুম সামলাবেন

ভারতের ফরিদাবাদের ফোর্টিস হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের পরিচালক ড. বিনীত বাঙ্গা জানান, টানা কয়েক রাত না জেগে ভক্তদের উচিত একটি সুনির্দিষ্ট ঘুমের পরিকল্পনা করা। তিনি বলেন, ‘টানা কয়েক রাত জেগে খেলা দেখা এড়িয়ে চলতে হবে। দেরিতে শুরু হওয়া ম্যাচগুলোর আগে সামান্য সময় পাওয়ার ন্যাপ বা ছোট ঘুম দিয়ে নিলে শরীরের ওপর চাপ কমে এবং ক্লান্তি দূর হয়।’ পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্নায়বিক ও বিপাকীয় সমস্যা আরও বাড়তে পারে এবং পরবর্তী দিনের কর্মদক্ষতা ব্যাহত হতে পারে।

খেলা দেখার সময়ে খাবারের দিকে নজর দিন

দেরি করে রাতে খেলা দেখার সময় সাধারণত চিপস, ভাজাপোড়া খাবার, কোমল পানীয় কিংবা ঘন ঘন চা-কফি খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। চিকিৎসকদের মতে, এসব খাবার সাময়িক আনন্দ দিলেও তা হজমে ব্যাঘাত ঘটায় এবং ঘুমের ক্ষতি করে।

ড. বাঙ্গা ভাজাপোড়া ও তৈলাক্ত খাবারের পরিবর্তে হালকা খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ ভারী ও চর্বিযুক্ত খাবার বুক জ্বালাপোড়া, পেট ফাঁপা এবং অস্বস্তি তৈরি করতে পারে, যার ফলে খেলা শেষে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে।

আরেক চিকিৎসকের পরামর্শ, ‘ভারী ভাজা খাবারের বদলে বাদাম, ফলমূল বা ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর হালকা খাবার বেছে নিন। এটি সকালে শরীরে অ্যাসিডিটি ও অলসতা তৈরি হওয়া রোধ করবে।’

ক্যাফেইন নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত পানি খাওয়া

রাত জেগে খেলা দেখার জন্য অনেকেই কফি, চা বা এনার্জি ড্রিংকের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু অতিরিক্ত ক্যাফেইন খেলা শেষ হওয়ার পরও সহজে ঘুমাতে দেয় না। চিকিৎসকরা রাতভর পর্যাপ্ত পানি পান করার এবং ক্যাফেইনের পরিমাণ সীমিত রাখার পরামর্শ দেন।

এ প্রসঙ্গে ড. মহেশ্বরী বলেন, ‘শরীর হাইড্রেটেড রাখতে নিয়মিত পানি পান করা জরুরি। চা বা কফির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে তা পরিমিত পরিমাণে পান করা উচিত।’ পর্যাপ্ত পানি পান ঘুম কম হওয়ার কারণে সৃষ্ট মাথাব্যথা ও ক্লান্তি দূর করতেও সাহায্য করে।

চোখের সুরক্ষায় স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ

টিভি, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ম্যাচ দেখলে চোখের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। চোখের সুরক্ষায় ঘরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখা, স্ক্রিনের ব্রাইটনেস বা উজ্জ্বলতা সামঞ্জস্য করা এবং মাঝে মাঝে চোখকে বিশ্রাম দেওয়া উচিত। রাত জাগার সময় স্ক্রিনে ‘ব্লু-লাইট ফিল্টার’ ব্যবহার করলে চোখের ওপর চাপ কমে। এছাড়া খেলা দেখার সময় মাঝে মধ্যে স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া বা ঘন ঘন চোখের পলক ফেলা চোখকে আরাম দেয়।

হাফটাইমে শরীর সচল রাখুন

একটানা দীর্ঘ সময় বসে থাকলে শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া, পেশিতে অস্বস্তি এবং রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা হতে পারে। চিকিৎসকরা হাফটাইমের ১৫ মিনিটের বিরতিকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন। ড. মহেশ্বরী বলেন, ‘হাফটাইমের সময় উঠে দাঁড়ানো, একটু হাত-পা টানটান (স্ট্রেচিং) করা বা ঘরের মধ্যে সামান্য হাঁটাহাঁটি করা রক্ত সঞ্চালন সচল রাখতে সাহায্য করে।’

দীর্ঘস্থায়ী রোগীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এই টুর্নামেন্টের সময় বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।

ড. বাঙ্গার মতে, ঘুমহীনতা এই রোগগুলোর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যেন খেলার উত্তেজনায় রোগীরা ওষুধ খেতে ভুলে না যান, খাবার খেতে দেরি না করেন কিংবা শরীরের কোনো খারাপ লক্ষণ অবহেলা না করেন। ম্যাচের সময় যাই হোক না কেন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খাওয়া এবং রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

সচেতনভাবে উপভোগ করুন বিশ্বকাপ

ফিফা বিশ্বকাপ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া উৎসব। একটু সচেতনতা ও পূর্ব পরিকল্পনা থাকলে স্বাস্থ্য ঠিক রেখেই এই আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব। ম্যাচের আগে ছোট ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত জলপান, সীমিত ক্যাফেইন এবং হাফটাইমে সামান্য হাঁটাচলা আপনাকে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে প্রাণবন্ত রাখবে।

ড. মহেশ্বরীর ভাষায়, ‘প্রতিটি গোল উপভোগ করার পাশাপাশি সুস্থ থাকাও পুরোপুরি সম্ভব। সামান্য কিছু স্মার্ট সিদ্ধান্ত আপনাকে খেলার রাতেও যেমন সতেজ রাখবে, ঠিক তেমনি পরের দিন সকালের কাজের জন্যও কর্মক্ষম রাখবে।’

সূত্র: এনডিটিভি

প্রতিছবি ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।