আজ পবিত্র হজ, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত আরাফার প্রান্তর
আজ মঙ্গলবার বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মিলন পবিত্র হজের মূল দিন। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক’… ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে মুখরিত পবিত্র আরাফাতের ময়দান। যার অর্থ: ‘আমি হাজির। হে আল্লাহ! আমি হাজির। তোমার কোন শরিক নেই। সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধুই তোমার। সাম্রাজ্য তোমারই। তোমার কোন শরিক নেই।’
ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম এই ফরজ ইবাদত পালনে হাজিরা আরাফার ময়দানে অবস্থান করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও আত্মশুদ্ধির জন্য প্রার্থনায় মগ্ন রয়েছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতির মুসলমানদের একত্রিত করে হজ। অনেকের মতে, এই সমাবেশ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক।
আজ প্রভাত থেকে আরাফার আদিগন্ত মরু প্রান্তর এক অলৌকিক পুণ্যময় শুভ্রতায় ভরে উঠেছে। সফেদ-শুভ্র দুই খণ্ড কাপড়ের এহরাম পরিহিত হাজিদের অবস্থানের কারণে সাদা আর সাদায় একাকার। পাপমুক্তি আর আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এই পবিত্র হজ পালন করছেন।
আজ ফজরের পর গোটা দুনিয়া থেকে আগত ১৫ লক্ষাধিক মুসলমান ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশি হজযাত্রীর সংখ্যা ৭৮ হাজারের বেশি। সফেদ-শুভ্র এহরাম পরিহিত হাজিদের উপস্থিতিতে চার বর্গমাইল আয়তনের আরাফাতের বিশাল প্রান্তর সাদা রঙে একাকার হয়ে গেছে।
হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন হিসেবে বিবেচিত আরাফায় অবস্থান আজ ৯ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলবে। এ সময় হাজিরা ইবাদত, জিকির-আযকার, দোয়া ও তওবায় মশগুল থাকবেন। একই সঙ্গে তারা হজের খুতবা শ্রবণ করবেন এবং জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন।
এ বছর আরাফাতের মসজিদে নামিরায় হজের খুতবা প্রদান করবেন মদিনার মসজিদে নববির ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশ্বের ৫০টি ভাষায় হজের খুতবার অনুবাদ সম্প্রচার করা হবে। এর মধ্যে বাংলা ও উর্দুসহ বিভিন্ন ভাষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সূর্যাস্তের পর হাজিরা আরাফাত ত্যাগ করে মুযদালিফার উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে আদায় করে রাতযাপন করবেন। একই সঙ্গে মিনায় শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় কংকর সংগ্রহ করবেন।
পরদিন ১০ জিলহজ মিনায় ফিরে হাজিরা পর্যায়ক্রমে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি, মাথা মুণ্ডন এবং তাওয়াফে জিয়ারত সম্পন্ন করবেন। পরে ১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করে তিনটি জামারাতে পাথর নিক্ষেপের আনুষ্ঠানিকতা পালন করবেন।
ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, মহান আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যত হলে শয়তান তাঁকে প্ররোচিত করার চেষ্টা করে। তখন তিনি শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করেন। সেই ঘটনার স্মরণেই হাজিরা প্রতীকী শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করেন।
হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মক্কায় ফিরে হাজিরারা বিদায়ী তাওয়াফ সম্পন্ন করবেন। কাবা শরিফ সাতবার প্রদক্ষিণের মাধ্যমে শেষ হবে তাদের পবিত্র হজব্রত।
এর আগে সোমবার সারাদিন ও রাত মিনায় অবস্থান করেন হজযাত্রীরা। মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মিনা হজ মৌসুমে পরিণত হয় বিশাল তাঁবুর নগরীতে। লাখো হাজি সেখানে নামাজ, জিকির ও অন্যান্য ইবাদতে সময় কাটান।
পবিত্র হজ উপলক্ষে মক্কা, মদিনা, মিনা, আরাফাত ও মুযদালিফা এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সৌদি সরকার। মোতায়েন করা হয়েছে এক লাখের বেশি নিরাপত্তাকর্মী।
এদিকে সৌদি আরবে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। তীব্র গরমে হাজিদের দুর্ভোগ কমাতে ৪০টির বেশি সরকারি সংস্থা এবং প্রায় আড়াই লাখ কর্মকর্তা কাজ করছেন। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, ড্রোন ক্যামেরা এবং উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থাও হজ পরিচালনায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
এদিকে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এর জেরে ইরান পাল্টা হামলা চালায় এবং পরে এপ্রিলে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়ে এবং ভ্রমণ ব্যয় বেড়ে যায়।
তবে এসব পরিস্থিতি হজযাত্রীদের উৎসাহ কমাতে পারেনি। অনেক মুসল্লি জানিয়েছেন, তারা বছরের পর বছর অপেক্ষা ও সঞ্চয়ের পর হজে আসার সুযোগ পেয়েছেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেই এই যাত্রা করেছেন। সৌদি আরবে বর্তমানে তীব্র গরম থাকায় হজযাত্রীরা ছাতা ও হাতপাখা ব্যবহার করছেন। স্বেচ্ছাসেবকেরা পানির বোতল বিতরণ করছেন এবং কুলিং ফ্যানের মাধ্যমে ঠাণ্ডা পানির কুয়াশা ছড়িয়ে গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত বছরের প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এ বছর স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও জনসমাগম ব্যবস্থাপনায় বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যাতে হাজিরারা নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন।
প্রতিছবি ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
