হাসিনার বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে যা ভাবছে আ.লীগের হাইকমান্ড
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে। স্থগিত করা হয় দলটির নিবন্ধনও। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি দলটি। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ এখন মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অবস্থানের দিকেই তাকিয়ে আছে।
দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আপাতত সহিংসতা এড়িয়ে গুছিয়ে রাজনীতি করার কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সামান্য রাজনৈতিক ‘স্পেস’ পেলেই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠন পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। অতীতে যাদের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের আর নেতৃত্বে না রাখার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। পুরোনো বিতর্কিত মুখ বাদ দিয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও তরুণ নেতৃত্ব সামনে আনার চিন্তাভাবনা চলছে।
আওয়ামী লীগে এখনো শেখ হাসিনাকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে দেখা হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিকল্প নেতৃত্ব সামনে আনার প্রশ্নটি দলীয় হাইকমান্ডের আলোচনায় রয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, ‘শেখ পরিবার’-এর হাতেই নেতৃত্ব থাকবে—এমন একটি কাঠামো বহাল রাখার প্রবল ইচ্ছা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা পেছন থেকে দলের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারেন, আর সামনে আনা হতে পারে নতুন কোনো মুখ।
জানুয়ারিতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, তার মা শেখ হাসিনা হয়তো আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন না। তিনি জানান, শেখ হাসিনা অবসর নিতে চেয়েছিলেন এবং এটিই ছিল তার শেষ মেয়াদ। ‘হাসিনা যুগের অবসান’ প্রসঙ্গে জয়ের মন্তব্য ছিল, ‘সম্ভবত, হ্যাঁ।’
তবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে এখনো বলছেন, শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। দলের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসায় নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। রাজনীতির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে ভাবা হবে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পরিবর্তন আনার প্রস্তুতিও রয়েছে বলে জানান তিনি।
দলের সভাপতির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগে এখনো শেখ হাসিনার বিকল্প কেউ নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনিই সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।’
আওয়ামী লীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক যুগান্তরকে জানান, শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে দলীয় কার্যালয় খোলার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে বলেও দাবি করেন তিনি। অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসছেন, প্রবাসে থাকা অনেকে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে হঠাৎ করে বড় কোনো কর্মসূচি না দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কৌশল নিয়েছে দলটি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কোটি কোটি নেতাকর্মী ও সমর্থক দেশে রয়েছেন। তাদের ঝুঁকিতে ফেলতে চাই না। তাই আপাতত কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। বিএনপির অবস্থান আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।”
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। তার সাম্প্রতিক বক্তব্য ও পদক্ষেপকে তারা ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখছেন। ফলে দলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিগগিরই প্রত্যাহার হতে পারে—এমন আশাও করছেন তারা।
অন্যদিকে সোমবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আইনগতভাবে যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেভাবেই বিষয়টি দেখা হবে।
পরদিন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানানোর পর স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান বলেন, বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না; তারা আইনের শাসনে আস্থাশীল।
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এখন দ্বৈত কৌশলে এগোচ্ছে—একদিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে অটুট রাখার বার্তা, অন্যদিকে বাস্তবতা বিবেচনায় বিকল্প নেতৃত্ব সামনে আনার সম্ভাবনা খোলা রাখা। তবে কার্যকরভাবে রাজনীতিতে ফিরতে সরকারের আনুষ্ঠানিক ‘স্পেস’ বা ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে দলটি।
প্রতিছবি ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
