বাউলশিল্পীদের ওপর হামলা, আবুল সরকারের মুক্তি দাবি
মানিকগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার বাউলশিল্পী আবুল সরকারের ভক্তরা হামলার শিকার হয়েছেন। অবিলম্বে বাউলের মুক্তি ও হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
মানিকগঞ্জে রোববার ‘মানিকগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের আলেম-ওলামা ও তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে থাকা একদল ব্যক্তি এবং গ্রেপ্তার আবুল সরকারের ভক্ত-অনুরাগীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে এই হামলার ঘটনা ঘটে। এতে বাউল আবুল সরকারের তিন অনুসারীসহ মোট চারজন আহত হয়েছেন।
বাউলশিল্পী আবুল সরকারের সহকারি বাউলশিল্পী রাজু সরকার ডয়চে ভেলেকে বলেন, আমাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। এটা দেখেই তারা আমাদের কর্মসূচির সময় কর্মসূচি দিয়েছে। তারপরও আমরা কিন্তু আমাদের কর্মসূচি দুই ঘন্টা পিছিয়ে ১১টায় নিয়েছিলাম। তারপরও তারা আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। আমরা শান্তি চাই, হানাহানি নয়। আমরা আবুল সরকারের মুক্তি চাই। কারও সঙ্গে আমরা বিবাদে জড়াতে চাই না।
বাউলশিল্পী আবুল সরকারের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বাদী মানিকগঞ্জের ঘিওর বন্দর মসজিদের ইমাম মুফতি মো. আবদুল্লাহ ডয়চে ভেলেকে বলেন, আমাদের কর্মসূচি ছিল পূর্বঘোষিত। বরং তারা অল্প কয়েকজন লোক নিয়ে এসে বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করেছে। আমরা বাধা না দিলে অনেক বেশি মানুষ আহত হতেন। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছি।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
গত ৪ নভেম্বর মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জাবরা এলাকায় খালা পাগলীর মেলায় পালাগানের আসরে যাত্রাপালা হয়। সেখানে বাউলশিল্পী আবুল সরকার যাত্রাপালার মধ্যেমৌলবাদ নিয়ে কথা বলেন। মাজার ভাঙা নিয়েও কথা বলেন। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার রাতে মাদারীপুরে একটি গানের আসর থেকে আবুল সরকারকে আটক করে মানিকগঞ্জ ডিবি পুলিশের একটি দল।
শুক্রবার সকালে তাকে জেলা ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ওইদিন দুপুরে ধর্ম নিয়ে তার মন্তব্যের প্রতিবাদে ঘিওর বন্দর মসজিদের ইমাম মুফতি মো. আবদুল্লাহসহ পাঁচ জন একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় তারা উল্লেখ করেছেন, ইসলাম ও মহান আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন আবুল সরকার।
ওই মামলায় আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সন্ধ্যায় মানিকগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নেওয়া হয়। বাউলশিল্পী আবুল সরকারের কঠোর শাস্তির দাবিতে ওইদিন মানিকগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে ‘আলেম-ওলামা ও তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল হয়। এ সময় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মুফতি আবদুল্লাহ আল ফিরোজসহ কয়েকজন বক্তব্য দেন।
আবুল সরকারের সহকারি শিল্পী রাজু সরকার ডয়চে ভেলেকে বলেন, আবুল সরকারের পালাগানের পুরো বক্তব্য প্রচার না করে একটি গোষ্ঠী তার বক্তব্য আংশিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে পরিবেশ ঘোলাটে করছেন। মহান আল্লাহ পাকের তিনটি সৃষ্টির মধ্যে কোনটি আগে করা হয়েছে, প্রতিপক্ষ বাউলশিল্পীকে এমন প্রশ্ন করেছিলেন আবুল সরকার। মহান আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তি করেননি। ওই অনুষ্ঠানে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। ওই গোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হয়ে আবুল সরকারের পালাগানের মন্তব্যের ভিডিওর খণ্ডিত অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেছে। তারা বিশৃঙ্খলা করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও হামলা
রোববার সকালে জেলা শহরে বাউলশিল্পী আবুল সরকারের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে ‘মানিকগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের আলেম-ওলামা ও তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে থাকা একদল ব্যক্তি। একই সময়ে আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করেন তার ভক্তরা। সকাল ১০টার দিকে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ‘মানিকগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের আলেম-ওলামা ও তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে একদল ব্যক্তি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। তারা শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলার প্রধান ডাকঘর কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করেন।
অন্যদিকে, মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করেন তার ভক্ত-অনুরাগীরা। কিন্তু অন্য পক্ষের মিছিলের কারণে তারা প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে কর্মসূচি পালন না করে দক্ষিণ সেওতা এলাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দক্ষিণ পাশে জড়ো হন।
অন্য পক্ষের সমাবেশস্থল থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ গজ দূরে শহীদ মিনারের অবস্থান। সেখানে আবুল সরকারের ভক্ত-অনুসারীদের অবস্থানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বেলা পৌনে ১১টার দিকে ‘মানিকগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের আলেম-ওলামা ও তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে থাকা ব্যক্তিদের হামলায় আবুল সরকারের তিন ভক্ত-অনুরাগী আহত হন।
আহত ভক্তরা হলেন জেলার শিবালয়ের শাকরাইল গ্রামের আবদুল আলীম (২৫), সিঙ্গাইরের তালেবপুর গ্রামের আরিফুল ইসলাম (২৯) ও হরিরামপুরের কামারঘোনা গ্রামের জহিরুল ইসলাম (৩২)। আহত অন্যজন হলেন সদর উপজেলার বরঙ্গাখোলা গ্রামের আবদুল আলীম (২৭)।
ঘিওর বন্দর মসজিদের ইমাম মুফতি মো. আবদুল্লাহ ডয়চে ভেলেকে বলেন, তারাও আমাদের উপর হামলা করেছে। এতে মাওলানা আব্দুল আলীম নামের এক মাদরাসা শিক্ষকসহ দুইজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) আবদুল্লাহ আল মামুন ডয়চে ভেলেকে বলেন, অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে তৌহিদী জনতার একটি অংশ আবুল সরকারের সমর্থকদের ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে তিন-চারজন আহত হন। মাওলানা আব্দুল আলীম নামে মাদরাসা শিক্ষক আহত হওয়ার যে খবর ছড়িয়ে পড়েছে সেটা ঠিক নয়। উনি আসলে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে গিয়ে মাথাঘুরে পড়েছিলেন। তাকে কেউ আঘাত করেনি। পরে তিনি সুস্থ্য হয়েছেন। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিস্থিতি এখন শান্ত ও স্বাভাবিক আছে।
আবুল সরকারের মুক্তি দাবি ও হামলার নিন্দা
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স ডয়চে ভেলেকে বলেন, সরকারের প্রছন্ন মদদ ছাড়া এই ধরনের হামলা সম্ভব না। আমরা দেখছি, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই এক ধরনের মব ছড়িয়ে বাউলশিল্পী ও মাজারের উপর হামলা করা হচ্ছে। কিন্তু সরকার এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আমরা দাবি জানাই, দ্রুত এই ধরনের মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি গ্রেপ্তার হওয়া আবুল সরকারসহ এই ধরনের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দিতে হবে।
নারী অধিকার কর্মী খুশি কবীর ডয়চে ভেলেকে বলেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উপর যে ধরনের আঘাত হানা হচ্ছে, সেটা প্রতিহত করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু আমরা সরকারকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখছি না। দ্রুত আবুল সরকারের মুক্তিসহ এই ধরনের কর্মকাণ্ড যারা ঘটাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
অবিলম্বে বাউলশিল্পী আবুল সরকারের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে বাংলাদেশ লেখক শিবির। সংগঠনটির সভাপতি কাজী ইকবাল ও সাধারণ সম্পাদক শফি রহমান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে খেয়াল করছি, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের আমলে যেভাবে এ দেশে ভিন্নমতের ওপরে দমন-পীড়ন চলছিল, এখনো সেই ধারা ভিন্নভাবে জারি রাখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে নির্যাতন জারি রেখেছিল। সেই জায়গা দখল করার চেষ্টা করছে এখনকার তথাকথিত আলেম সমাজ ও তৌহিদী জনতা নামধারী রাজনৈতিক ধুরন্ধররা।
এর আগে বাউলশিল্পী আবুল সরকারের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘সম্প্রীতি যাত্রা’-র উদ্যোগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে এই মানববন্ধন হয়। এতে বিভিন্ন বাউল–সুফি সংগঠন, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল, ‘আবুল সরকারের মুক্তি চাই’, ‘গান, জ্ঞান ও ভক্তির নিরাপত্তা চাই’, ‘মাজার দরবার রক্ষা করো’, ‘পৃথিবীটা একদিন বাউলের হবে’ -এমন বক্তব্য সম্বলিত পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড।
মানববন্ধনে বাংলাদেশ সুফি জাগরণ পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, এই দেশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সুফি-বাউলেরা সব সময় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। পরিকল্পিতভাবে শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অবিলম্বে তাকে মুক্তি না দিলে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার বলেন, একদিন পৃথিবীটা বাউলের হবে। শিল্পীদের ওপর হামলা ও গ্রেপ্তার মানবাধিকার লঙ্ঘন- এটি মেনে নেওয়া হবে না।
প্রসঙ্গত, কারাগারে যাওয়া আবুল সরকার মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার তিল্লী ইউনিয়নের পারতিল্লী এলাকার বাসিন্দা। তিনি এলাকায় বাউলশিল্পী ছোট আবুল সরকার নামে পরিচিত।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সমীর কুমার দে। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।
প্রতিছবি ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
