নিয়ন্ত্রণে আসেনি সেজান জুস ফ্যাক্টরির আগুন, নিহত বেড়ে ৫৫

9 July 2021, 6:01:28

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কারখানার ভেতর থেকে এক এক করে মরদেহ বের করে আনা হচ্ছে। আগুন লাগার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। বৃহস্পতিবার ( ৮ জুলাই) বিকালে সেজান জুস কারখানায় আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও ডেমরা ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট কাজ শুরু করছে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ৫২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আর হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। আজ শুক্রবার (৯ জুলাই) এখন পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ভেতরে মোট কতজনের মরদেহ রয়েছে এ ব্যাপারে দায়িত্বরত কেউ কোনো কথা বলেননি।

ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় উদ্ধারকাজ শুরু হবে। তালাবদ্ধ থাকায় চতুর্থ তলার কোনো শ্রমিক বের হতে পারেননি। তারা দগ্ধ হয়ে ভবনের ফ্লোরেই মৃত্যু হয়েছে। জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্মণ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এদিকে নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের ১০ হাজার টাকা করে অনুদানের ঘোষণা করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ।

এর আগে শুক্রবার সকালেও কারখানার চারতলায় আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। এর আগে ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক এখনও ওই ভবনের ভেতরে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন অন্যান্য শ্রমিক ও নিখোঁজের স্বজনরা। শ্রমিকদের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ছয়তলা ভবনটির মধ্যে চতুর্থতলার শ্রমিকরা কেউ বের হতে পারেননি। সিকিউরিটি ইনচার্জ চারতলার কেচি গেটটি বন্ধ করে রাখায় কোনো শ্রমিকই বের হতে পারেননি। সেখানে ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক কাজ করতেন।

তারা জানান, চতুর্থতলার শ্রমিকদের ইনচার্জ মাহবুব, সুফিয়া, তাকিয়া, আমেনা, রাহিমা, রিপন, কম্পা রানী, নাজমুল, মাহমুদ, ওমরিতা, তাছলিমাসহ প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনরা কারখানার সামনে এসে ভিড় করছেন। তাদের আহাজারিতে কারখানার চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছে। স্বজনরা অভিযোগ করে জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলায় কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। আগুন লাগার পরও কারখানা কর্তৃপক্ষ কেচি গেটের তালা না খোলায় শ্রমিকরা বের হতে পারেননি।

কাঞ্চন ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ শাহ আলম বলেন, মধ্যরাতে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও সকাল ৬টার দিকে আবার কারখানার চারতলায় আগুন বাড়তে থাকে। আগুন নিয়ন্ত্রণের আগ পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। এর আগে বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় অবস্থিত ওই কারখানায় আগুন লাগে।

আগুন লাগার পরেও গেট খোলেনি কর্তৃপক্ষ: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড কারখানায় বৃহস্পতিবার বিকালে লাগা আগুন একনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এদিকে কারখানার আগুন নেভাতে দেরির অভিযোগ করে একটি ভবনে ভাঙচুর করেছেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনের পাশের ভবনটিতে শুক্রবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে তারা ভাঙচুর চালান। ওই সময় ওই ভবনের কাছে সড়কে প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেলসহ ১০ থেকে ১২টি গাড়িও ভাঙচুর করেন তারা। লাঠি হাতে থাকা বিক্ষুব্ধ লোকজন ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবোরধ করতে চাইলে পুলিশ তাদের বাধা দেন। ওই সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে।

কারখানা সূত্রে জানা গেছে, ছয় তলার কারখানাটির প্রতিটি তলায় একটি করে সেকশন রয়েছে। প্রতিটি সেকশনে একটি করে প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট রয়েছে। তিন শিফটে ২৪ ঘণ্টায় কারাখানটিতে বিস্কিট, চকোলেটসহ নানা রকম খাদ্যদ্রব্য তৈরি হয়। প্রতি শিফটে শ্রমিক ঢোকার পর সেকশনের কেচি গেট বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। শিফট শেষ হওয়ার পর গেট খোলে কর্তৃপক্ষ।

শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, কারখানার নিচে গোডাউনের কার্টুনে আগুন লাগার বিষয়টি ওপরে কর্মরত অনেক শ্রমিকই জানতেন না। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে আগুন গোটা বিল্ডিংয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় শ্রমিকরা বাঁচার জন্য দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। কিন্তু আগুন লাগার পরেও কর্তৃপক্ষ সেকশনে থাকা কেচি গেট খুলছিল না। ফলে অনেক শ্রমিক জীবন বাঁচানোর জন্য বিল্ডিং থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়েন। এ সময় দুই শ্রমিক মারা যান।

তারা আরও অভিযোগ করেন, কেচি গেট বন্ধ থাকায় প্রথমে শ্রমিকরা বের হতে পারেননি। পরে আগুনের ব্যাপকতা বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের চিৎকার চেচামেচিতে কেচি গেট খুলে দেয় কর্তৃপক্ষ। ফলে অনেক শ্রমিক বের হতে পেরেছিলেন আরও অনেকে ভেতরে আটকা পড়েন।

হৃদয় নামের এক শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, আমি চার তলার সেকশনে কাজ করছিলাম। আগুন লাগার পর আমরা ভেতরে থেকে বের হতে পারছিলাম না গেট বন্ধ থাকায়। পরে আগুন বেড়ে গেলে গেট খুলে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে আগুন সেকশনে চলে আসায় অনেক লাফ দিয়ে নিচে পড়েন জীবন বাঁচাতে। আবার আগুনের ধোঁয়ার কারণে অনেককে সেকশনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতেও দেখেছি। মো. রাব্বানী নামে আরেক শ্রমিক জানান, যদি সময় মতো কেচি গেট খুলে দেওয়া হতো তাহলে আমরা সবাই বেরিয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু কেচি গেট বন্ধ থাকায় আমরা শুরুতে বের হতে পারিনি। পরে গেট খুলে দেওয়া হলেও আমার ধারণা ৩০-৪০ জন শ্রমিক বের হতে পারেননি।

এদিকে নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনরা তাদের স্বজনদের খোঁজে পেতে ঘটনাস্থলে ভিড় করেছেন। স্বজনদের উদ্ধারের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের কাছে আকুতি জানাচ্ছেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ নুসরাত জাহান বলেন, ইতোমধ্যে ফায়ার ফাইটাররা ১৪-১৬ জনকে ভেতর থেকে উদ্ধার করেছে। তবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না ভেতরে আরও মানুষ আছেন কি-না। তবে শ্রমিকরা দাবি করছেন, ভেতরে আরও মানুষ আটকা থাকতে পারে।

প্রতিছবি ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।