আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনার ফাঁসির আদেশ
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার প্রথম অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং দ্বিতীয় অভিযোগ ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে অপর দুই আসামী আসাদুজ্জামান কামালের মৃত্যুদণ্ড ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
আজ সোমবার (১৭ নভেম্বর) দুপুর ২টা ৪৭ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টায় ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ছয়টি অধ্যায়ে ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায় পড়া শুরু করেন বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার।
মামলার অভিযোগে শেখ হাসিনাকে জুলাই-আগস্টে নৃশংস ঘটনার ‘মাস্টারমাইন্ড, হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মামলার তিন আসামির বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে – গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এরপর তিনি হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের দমন করার নির্দেশ দেন। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা, রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ।
অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে সাক্ষ্যের পাশাপাশি ফাঁস হওয়া বিভিন্ন ভিডিও এবং আন্দোলন দমনে টেলিফোন কথোপকথনে শেখ হাসিনার নির্দেশনা আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
মামলার অন্য দুই আসামি হলেন- পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। শেষজন এই মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছেন। আর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক। তারা ভারতে অবস্থান করছেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সাবেক সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণা করা হলো।
রায়টি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ও ট্রাইব্যুনালের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে সরাসরি দেখানো হয়।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আরও তিনটি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে দুটি মামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে সংঘটিত গুম-খুনের ঘটনায় শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। আরেকটি মামলা করা হয়েছে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়।
জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে অর্ধশতাধিক শিশুসহ ১৪০০ ছাত্র-শ্রমিক-জনতা নিহত হয়েছেন সরকারি বাহিনী ও আওয়ামী লীগের হামলায়। আহত হয়েছেন হাজারো মানুষ।
আর সরকারের প্রকাশিত গেজেটে এখন পর্যন্ত সাড়ে আট শ জুলাই শহীদের নাম এসেছে। পুরো তালিকা তৈরি কাজ চলছে।
চব্বিশের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম মামলাটি (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।
এই ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো মামলায় আসামি রাজসাক্ষী (‘অ্যাপ্রুভার’) হয়েছেন। দোষ স্বীকার করে ঘটনার বিবরণ দিতে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করলে তা মঞ্জুর করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর এই ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচারকাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
চলতি বছরের ১২ মে চিফ প্রসিকিউশন কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা। ১ জুন প্রসিকিউশন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে।
ওই অভিযোগে শেখ হাসিনাকে জুলাই-আগস্টে নৃশংস ঘটনার ‘মাস্টারমাইন্ড, হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তিন আসামির বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়।
এরপর উভয়পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ২৩ অক্টোবর রায়ের তারিখ নির্ধারণের জন্য ১৩ নভেম্বর দিন ধার্র্য করেন ট্রাইব্যুনাল। সেদিন আদালত রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিনটি (১৭ নভেম্বর) নির্ধারণ করেন।
শুনানির শেষ দিনে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সমাপনী বক্তব্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেন।
আর রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের খালাস চান।
রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান, রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন ও অন্য আইনজীবীরা আদালত কক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিছবি ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
























Comments: