আকাশ তরঙ্গ অবৈধ দখলে

সরকারের অনুমোদন ছাড়াই দেশে সম্প্রচারিত হচ্ছে দুই শতাধিক বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল। ক্যাবল ও ফিড অপারেটরা এসব চ্যানেল বেআইনিভাবে সম্প্রচার করছেন।

প্রতিটি চ্যানেল সম্প্রচারের ক্ষেত্রে তরঙ্গ বরাদ্দ নিতে হয়। এক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বেআইনিভাবে এসব চ্যানেল পরিচালনার অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় বিদেশে টাকা পাচার করা হচ্ছে।

দেশে অনুমোদিত চ্যানেল রয়েছে ১২৫টি। অথচ সম্প্রচারিত হচ্ছে প্রায় ৩৫০টি চ্যানেল। বাকি ২২৫টির মতো চ্যানেল বেআইনিভাবে সম্প্রচারিত হচ্ছে। দেশের আকাশ তরঙ্গে বেআইনিভাবে পরিচালিত চ্যানেলের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে।

ফলে এ শিল্পে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ১১ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি চিঠি ইস্যু করে। এর আগে ৫ নভেম্বর তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর পাঠানো হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ক্যাবল অপারেটররা বছরে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করেন। এর বড় অংশই করছে অবৈধ চ্যানেলগুলো। এ আয়ের ওপর সরকার ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৩৫ শতাংশ কর্পোরেট করসহ বছরে ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব পাওয়ার কথা। অথচ অপারেটররা দিচ্ছেন মাত্র ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা।

বাকি ১ হাজার ৯০ কোটি থেকে ১ হাজার ৯২ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে। যেহেতু বিদেশি মূল এজেন্ট দ্বারা ব্যবসাটি নিয়ন্ত্রতি হচ্ছে তাই আয়ের একটি বড় অংশই পাচার করে পাঠানো হচ্ছে মূল এজেন্টের কাছে। এ হিসাবে বছরে গড়ে লাইসেন্স ফি, দেশে বিজ্ঞাপন খাতে আয় বিদেশে পাঠানো ও বিদেশি বিজ্ঞাপনের অর্থ দেশে না আসায় এসব মিলে বছরে শত শত কোটি টাকা পাচার হচ্ছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও রাজস্ব বোর্ডের মতে, এ খাতে পাচারের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে, দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী দেখিয়ে বিভিন্ন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার করে আয়ের অর্থও দেশ পাচ্ছে না। বিদেশে চলে যাচ্ছে।

এগুলো বন্ধের জন্য ক্যাবল চ্যানেলগুলোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ডিজিটাল করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। ভারত ইতোমধ্যে এ ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছে। যে কারণে এ খাতে তাদের স্থানীয় আয় যেমন অনেক বেশি, তেমনি বিদেশি আয়ও বেড়েছে।

এ বিষয়ে ক্যাবল অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আনোয়ার পারভেজ বলেন, ক্যাবল চ্যানেল পরিচালনার ক্ষেত্রে কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এটিকে ডিজিটাল করা ছাড়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কোন এজেন্ট ক’টি চ্যানেল চালায় তা ওই এজেন্টের কর্মচারী ছাড়া অন্য কেউ জানতে পারে না।

পে চ্যানেলের বিপরীতে বছরে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা ফি পরিশোধ করতে হয়। অনেক চ্যানেল আছে যেগুলোতে কোনো ফি লাগে না। অনেকে নিজস্ব চ্যানেলও পরিচালনা করে।

তিনি আরও বলেন, কোন চ্যানেলের ফি কে কোন দিক দিয়ে পরিশোধ করেন তাও কেউ জানেন না। যারা বৈধভাবে ব্যবসা করেন শুধু তারাই নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করেন। কিন্তু নিয়মের বাইরে যেগুলো পরিচালিত হয় সেগুলোতে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৩৫টি বাংলাদেশি টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারিত হচ্ছে। চলতি নভেম্বরে সর্বশেষ খেলাভিত্তিক চ্যানেল টি স্পোর্টস সম্প্রচার শুরু করে। দেশীয় চ্যানেলগুলোর বাইরে ৯০টি বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচারের অনুমোদন রয়েছে।

কিন্তু অনেক ক্যাবল ও ফিড অপারেটর ২৮০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত চ্যানেল সম্প্রচার করছে। আবার অনেক ক্যাবল ও ফিড অপারেটর লাইসেন্সের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর তা নবায়ন না করেই ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, ক্যাবল অপারেটর ও ফিড অপারেটর লাইসেন্সের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর নবায়ন না করে কতিপয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মালিক তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে লাইসেন্স নবায়নের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও অনেকেই বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করছেন না। এটা সংশ্লিষ্ট আইনের লঙ্ঘন। লাইসেন্স নবায়ন না করা বা অনুমোদনহীন ক্যাবল ও ফিড অপারেটরদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে ওই চিঠিতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এ ক্যাবল অপারেটররা অনুমোদনহীন বিদেশি টিভিগুলোকে যে টাকা দেয় তার সামান্য অংশ ঘোষণায় আসে। এর মাধ্যমে তারা বিপুল পরিমাণ ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, অনুমোদনহীন এবং অবৈধ চ্যানেল প্রদর্শন করে ক্যাবল অপারেটররা বছরে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন। এসব চ্যানল প্রচারের জন্য বিদেশি টিভি কোম্পানিকে টাকা দিতে হয়। যেহেতু অনুমোদন ছাড়া এগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে সে কারণে বৈধভাবে টাকা পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে ক্যাবল ও ফিড অপারেটরা অবৈধভাবে এসব অর্থ বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, অনুমোদিত চ্যানেলের বিপরীতে তাদের মূল এজেন্টকে প্রতি বছর গড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা করে ফি দিতে হচ্ছে। এগুলো স্থানীয় টাকায় মূল এজেন্টকে দেয়া হয়। মূল এজেন্ট কিভাবে চ্যানেল কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করেন তা সংশ্লিষ্টরা জানেন না। জানা গেছে, এসব অর্থও বৈধ চ্যানেলে না গিয়ে বেআইনিভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

এর বাইরে চ্যানেলগুলো দেশি বিজ্ঞাপন প্রচার থেকে যে আয় করছে তার একটি বড় অংশই বিদেশে পাচার হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশে সম্প্রচারের রেকর্ড দেখিয়ে বিদেশ থেকেও বিজ্ঞাপন বাবদ যে আয় করছে তা দেশে আসছে না। অথচ এ অর্থ দেশে আসার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, যেহেতু এসব বৈদেশিক মুদ্রার মালিক বাংলাদেশ, কিন্তু এগুলো দেশে আসছে না। ফলে বিদেশে পাচার বলে ধরে নিতে হবে। এভাবে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে।

তথ্য মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভে ডাটা ২০১৭ অনুযায়ী, দেশে ২ কোটি ৩৬ লাখ টেলিভিশন সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ৯৭ শতাংশ গ্রাহক অ্যানালগ ক্যাবল অপারেটরদের। ১ দশমিক ৭ শতাংশ ডিজিটাল ক্যাবল অপারেটর বেঙ্গল ও জাদুর। আর ১ দশমিক ৩ শতাংশ ডিটিএইচ সেবা প্রদানকারী আকাশের। অভিযোগ রয়েছে, অ্যানলগ ও ডিজিটাল- দুই শ্রেণির ক্যাবল অপারেটরদের এজেন্টরাই অবৈধ অনুমোদনহীন চ্যানেল প্রদর্শন করছে।

অপরদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) করা এক জরিপ অনুযায়ী দেশে ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি ক্যাবল টিভি সংযোগ চালু আছে। সে হিসেবে প্রতি মাসে ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা আয় করে ক্যাবল অপারেটররা। কিন্তু বৈধ পন্থায় এ আয় দেখা যায় না বলে এ খাত থেকে সরকার রাজস্ব পাচ্ছে না।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, অনুমোদনের বাইরে যেসব চ্যানেল অপারেটররা চালাচ্ছেন তাদের একটি তালিকা আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। আমরা দ্রুত অনুমোদনহীন চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।