মৃত মুক্তিযোদ্ধার প্লটও দখল করে মনির

বাড্ডার মেরুলে ডিআইটি প্রজেক্টে মৃত মুক্তিযোদ্ধার প্লট দখল করে গোল্ডেন মনির। রাজউকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে নথি গায়েব ও জাল ফাইল তৈরি করে মৃত ও জীবিত মানুষের প্লট দখল করা তার নেশায় পরিণত হয়েছিল।

শনিবার র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর তার এ ধরনের অনেক অপকর্মের কাহিনী একে একে বেরিয়ে আসছে। এরই মধ্যে ভুক্তভোগীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করেছেন।

এদিকে মনিরের বিরুদ্ধে র‌্যাবের দায়ের করা অস্ত্র, মাদক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের তিন মামলার তদন্তভার মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বাড্ডা থানার ওসি পারভেজ ইসলাম জানান, তিন মামলায় ১৮ দিনের রিমান্ডে থাকা মনিরকে এরই মধ্যে ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এর আগে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, যদি কোনো ভুক্তভোগী আইনি সহায়তা চেয়ে যোগাযোগ করেন তবে র‌্যাব তাকে সহায়তা করবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ১০ বছর আগে মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্টে ১৪ নম্বর রোডে মৃত মুক্তিযোদ্ধা একেএমএম আখতারুজ্জামানের সাড়ে তিন কাঠার একটি প্লট দখল করেন গোল্ডেন মনির।

পরে সেখানে পাঁচতলা বাড়িও নির্মাণ করা হয়। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা বিভিন্ন সরকারি দফতরে ছোটাছুটি করেও প্লটের দখল নিতে পারেননি। রাজউক অফিসে খোঁজ নিতে গিয়ে তারা জানতে পারেন, ওই প্লটের কোনো নথি রাজউকে নেই, গায়েব হয়ে গেছে।

গোল্ডেন মনির রাজউকে এমন এক সিন্ডিকেট তৈরি করে রেখেছে সেখানে নথি খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব। একেএম আখতারুজ্জামানের ছেলে আসিফ বুলবুল যুগান্তরকে বলেন, সাড়ে তিন কাঠার প্লটটি ২০১০ সাল পর্যন্ত আমাদের দখলে ছিল।

সেখানে টিনশেড বাড়ি করে আমরা ভাড়াও দিয়েছিলাম। ২০১০ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর মনিরের ক্যাডার বাহিনী প্লটটি দখলে নিয়ে পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণ করে। বিষয়টি নিয়ে আমি মনিরের সঙ্গে দেখাও করি।

তখন মনির বলেন, এই প্লটের বদলে আপনাদের অন্য জায়গায় একটি প্লট দিয়ে দেব। তখন আমি বললাম, আমাকে অন্য জায়গায় প্লট দেবেন কেন? এটা তো আমার বাবার জায়গা। এটা আমাদের দরকার।

পরে এ নিয়ে তার সঙ্গে আমাদের আর কথা হয়নি। এদিকে গোল্ডেন মনিরের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। বিশেষ করে ২০০৯-২০ সাল পর্যন্ত কী পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়েছেন তা অনুসন্ধান করেছে সংস্থাটি।

প্রাথমিকভাবে ৬১০ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২০ পর্যন্ত তিনি এই সম্পদ গড়েছেন। দুদকের উপপরিচালক শামসুল আলমের নেতৃত্বে এই অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে এক মাস আগে দুদক মনিরকে তলব করেছিল। তবে তিনি দুদকে যাননি। এর আগে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করায় ২০১২ সালে দুদক তার বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। ওই মামলায় শিগগিরই দুদক চার্জশিট দেবে।

এতে বলা হয়েছে, ভুয়া দাতায় মনির তার অবৈধ সম্পদ বৈধ করতেন। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন প্রকল্পের প্লট দখল করতে রাউজকের এনেক্স ভবনের পঞ্চমতলায় ৫১৪ নম্বর কক্ষে কার্যালয় স্থাপন করেছিলেন মনির।

২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর ওই কক্ষে রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদ পরিদর্শনে যায়। তখন সেখানে ৭০টি প্লটের জাল নথি পাওয়া যায়। রাজউকের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৫ জন কর্মকর্তার সিলসহ স্ট্যাম্পপ্যাড পাওয়া যায়।

ওই কক্ষ থেকেই ভুয়া নথি তৈরি করে নামে-বেনামে প্লট দখল করতেন মনির। এমনকি বিভিন্ন আবাসিক প্লটকে তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে বাণিজ্যিক প্লটে পরিণত করেন।

উল্লেখ্য, শনিবার রাজধানীর মেরুল বাড্ডার বাসা থেকে গোল্ডেন মনিরকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। রোববার তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে তিনটি মামলা হয়।

বর্তমানে তিনি রিমান্ডে আছেন। তাকে গ্রেফতারের পর সরকারের একাধিক সংস্থা তার অপকর্মের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে।