বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে

বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় এলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটির ক্ষমতার পরিবর্তনে সারা বিশ্বে নানা হিসাবনিকাশ চলছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকার ক্ষমতা নিলে ট্রাম্পের রক্ষণশীল নীতিতে পরিবর্তন আসবে। এতে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো লাভবান হবে।

বিশেষ করে এর আগে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে অকার্যকর করে দেয়ায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

কিন্তু বাইডেন রক্ষণশীল নীতি থেকে সরে আসবেন বলে আগেই ঘোষণা দিয়েছেন। আর এটি বাস্তবায়ন হলে রফতানি, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। তবে বাংলাদেশের শ্রমিক ইস্যুতে কিছুটা চাপ পড়বে বলে মনে করছেন তারা।

জানতে চাইলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প সাধারণভাবে অর্থনীতিতে যে সংরক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করে আসছিলেন, বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে তার প্রভাব পড়ত।

বাইডেন ক্ষমতায় এলে তার কিছুটা পরিবর্তন হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে পরোক্ষভাবে হলেও উপকৃত হবে বাংলাদেশ।

এ ছাড়া ট্রাম্পের কারণে বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে পলিসি নিচ্ছিল, তাতে পরিবর্তন আসবে। যেমন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

সংস্থাটিকে অকার্যকর করে দেয়ার পলিসি নিয়েছিল তারা। ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল, এই সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কাজে আসছে না। মনে হচ্ছে, জো বাইডেন সেই সব পলিসি থেকে সরে আসবেন।

কারণ, ইতোমধ্যে বাইডেন বলেছেন, ক্ষমতায় এলে বিশ্ব বাণিজ্যসহ অন্যান্য ইস্যুতে সহজ নীতি গ্রহণ করবেন। সিপিডির এই বিশেষ ফেলো বলেন, বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাবে, তাদের জন্য বিভিন্ন সহায়তার কথা বলা হচ্ছে।

সেটি এগিয়ে নেয়ার জন্য আলাপ-আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হবে। এটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে। ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে রক্ষণশীল নীতিতে ছিলেন ট্রাম্প।

তার বক্তব্য ছিল-যুক্তরাষ্ট্র সবার আগে অগ্রাধিকার। সেখানেই বিনিয়োগ করতে হবে। ক্ষমতার পরিবর্তন এলে ওই নীতিতে পরিবর্তন আসবে।

এতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আসার পথ তৈরি হবে। তবে কতটুকু আসবে, সেটি বলা মুশকিল। কারণ, বিভিন্ন পলিসির ওপর বিনিয়োগ নির্ভর করে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যে ইন্দো-প্যাসেফিক স্টাডিজ নিয়ে আসছে, তাতে কোনো পরিবর্তন দেখি না। কারণ, চীনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমান্তরালে এখানে কিছু করার চিন্তা করছে তারা।

ফলে এটি অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, টিকফাসহ অন্যান্য চুক্তিতে ডেমোক্র্যাটরা শ্রমিক ইস্যুকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেবে। তাদের দলের মধ্যে সব সময়ই শ্রমিকের বড় প্রভাব থাকে।

এতে বাংলাদেশের শ্রমিক ইস্যুতে মার্কিন চাপ কিছুটা বাড়বে। আর জিএসপি (বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার খাত) ইস্যুতেও তেমন কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না।

অর্থাৎ, জিএসপি আবার খুব সহজে আমরা ফিরে পাব-সেটি মনে হয় না। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা দেয়ার হার বাড়বে।

সামগ্রিকভাবে আমাদের ব্যবসা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি আরও বলেন, অনেকে বলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক হলে তাদের বাজার আমরা দখল করতে পারব।

তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে, অতীতে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বড় ধরনের ফলাফল পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সব ধরনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আমদানি, রফতানি, রেমিটেন্স (প্রবাসী আয়), বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রফতানি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আমদানির ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থান ষষ্ঠ। রেমিটেন্স আয়ের ক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থানে আমেরিকা।

২০১৯ সালে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের ৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে, যা বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের ৯ শতাংশ। এরমধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে।

বিনিয়োগের দিক থেকে রয়েছে দেশটির শক্তিশালী অবস্থান। সর্বশেষ বছরে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বিনিয়োগ ছিল ১৭ দশমিক ৪০ কোটি ডলার।

এ হিসাবে বাংলাদেশ চতুর্থ বড় বিনিয়োগকারী দেশ। এদিকে বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয়েও তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশটি থেকে রেমিটেন্সের পরিমাণ ২৪১ কোটি ডলার।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে ৫২তম বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশ। কিন্তু রানা প্লাজা দুর্ঘটনার জেরে ২০১৩ সালে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল করে দেয় তারা। এরপর সুবিধা ফিরে পেতে সব ধরনের চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কিছু পরিবর্তন হলেও তা খুব বেশি নয়।

তিনি বলেন, আমার মনে হয় না ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর খুব একটা বেশি প্রভাব পড়বে। কারণ, নতুন করে ডেমোক্র্যাট দল ক্ষমতায় এলেও সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে।

আর বাংলাদেশের মূল ইস্যু হল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার। কিন্তু এটি বাংলাদেশের দাবি থাকলেও তারা দিচ্ছে না।

টিকফা অ্যাগ্রিমেন্ট রয়েছে। এখানেও আলোচনা হয়; কিন্তু সিদ্ধান্ত কিছুই হয় না। জো বাইডেন এ ব্যাপারে কোনো পরিবর্তন আনবেন বলে মনে হয় না।

কারণ, দেশের মধ্যে প্রেসারে থাকবে ক্ষমতাসীনরা। অন্যদিকে আরেকটি ইস্যু রয়েছে-সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই। এখানেও সরকারের করণীয় কিছু নেই।

এখানে বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলো সিদ্ধান্ত নেয়। আর বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তারা কয়েকটি বিষয় দেখে।

এরমধ্যে রয়েছে: প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা, সুশাসন এবং সহজে ব্যবসা করার সূচক এবং গুণগত মানসম্পন্ন মানবসম্পদ। এসব দিক থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে।

সে কারণে উৎপাদনশীল খাতে খুব বেশি বিনিয়োগ আসে না। সরকার পরিবর্তন হলেও এ খাতে পরিবর্তনের তেমন সম্ভাবনা নেই।

জানা গেছে, টানা সাড়ে ৮ বছর পর্যন্ত ঝুলে আছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রফতানি সুবিধা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ২৪৩টি পণ্যের জিএসপি সুবিধা ছিল।

মোটা দাগে খাতগুলো হল: প্লাস্টিক, সিরামিক, গলফ খেলার উপকরণ, কার্পেট, চশমা, পতাকা এবং চুরুট ইত্যাদি। যদিও ওই তালিকায় তৈরি পোশাক ছিল না।

কিন্তু ২০১৩ সালের এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসে সহস্রাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। এর জের ধরে ওই বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার জিএসপি স্থগিত করে।

আর ১ সেপ্টেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। জিএসপি স্থগিত হওয়ার মানে হল-যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত বা শুল্কছাড় সুবিধা পেত, সেগুলো আর পাচ্ছে না।

ফলে এসব পণ্য রফতানিতে প্রচলিত হারে শুল্ক দিতে হচ্ছে। এতে পণ্যভেদে শুল্কহার ১২-২০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই হারে শুল্ক দিয়ে রফতানি করায় দেশটির বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে।

এতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। তবে এ ব্যাপারে মির্জ্জা আজিজ বলেন, জিএসপি সুবিধার আওতায় যেসব পণ্য ছিল, তা যুক্তরাষ্ট্রে মোট রফতানির ৫ শতাংশেরও কম।

আর পোশাক খাতে তারা এ সুবিধা দেবে না বলে বহু আগেই জানিয়ে দিয়েছে। এদিকে জিএসপি সুবিধা স্থগিতের পর কারখানায় কাজের পরিবেশ উন্নয়নে ১৬টি শর্ত দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

আর এই শর্তগুলো পূরণ হলে ৬ মাস পর বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সাড়ে ৮ বছর চলছে। এ ক্ষেত্রে মূল্যায়ন না করে শুধু আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে।

২০১৫ সালে মোট ১২২টি দেশের জিএসপি সুবিধা নবায়ন করে যুক্তরাষ্ট্র। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য-ব্রাজিল, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, তুরস্ক, ভেনিজুয়েলা, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া এবং থাইল্যান্ড অন্যতম।

কিন্তু বাংলাদেশ ও রাশিয়াকে জিএসপি সুবিধা দেয়া হয়নি।

জানতে চাইলে আমেরিকা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (অ্যামচেম) প্রেসিডেন্ট সৈয়দ এরশাদ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আমাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক মূলত বাণিজ্যিক।

বিনিয়োগ ও রফতানিতে শীর্ষে আছে দেশটি। যখন থেকে গার্মেন্ট রফতানি শুরু হয়, তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এক নম্বরে ছিল। এখনও সেটি ধরে রেখেছে।

বর্তমানে তৈরি পোশাকের এক-পঞ্চমাংশ যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করছি। ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যেসব পণ্য রফতানি করা হয়, সেগুলোর চাহিদা সেখানে রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে চীনের রফতানি কমলে আমাদের বৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশি। তৈরি পোশাকে আমাদের জিএসপি ছিল না। তবে জিএসপির জন্য বেশ কিছু পণ্য রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তার মতে, সরকার পরিবর্তন হলেও বাণিজ্যিক নীতির তেমন পরিবর্তন হয় না। তবে একটি সম্ভাবনা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে আগে আমাদের চুক্তি হয়েছিল। যার নাম টিকফা।

এটি নিয়ে ৫টি মিটিং হয়েছিল। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তন হলে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করা হয়। তিনি বলেন, দেশটির বড় দুটি এজেন্সি রয়েছে।

এগুলো হল: ইউএসটিআর (ইউনাইটেড স্টেড ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ) এবং ইউএসটিডিএ (ইউনাইটেড স্টেড ট্রেড ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি)। এই দুটি সংগঠন তাদের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট করে।

আর বাংলাদেশের নেগোসিয়েশনগুলো হয় ইউএসটিডিএ-র সঙ্গে। এ ক্ষেত্রে এই সংস্থার নতুন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে পারলে আমরা লাভবান হব।

তিনি বলেন, সবার আগে আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে পারলে বড় বিনিয়োগ আসবে।

জানা গেছে, প্রযুক্তি ও পুঁজি-দু’দিক থেকেই সারা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ৯৯ লাখ বর্গকিলোমিটারের এ দেশটির মোট জনসংখ্যা ৩৩ কোটি।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার সাড়ে ১৮ ট্রিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ৫৭ হাজার ২২০ ডলার। এ কারণে দেশটির ক্ষমতা পরিবর্তন সারা পৃথিবীতেই বড় বার্তা দেয়।—— যুগান্তর