রফিক-উল হকের মৃত্যুতে আইন অঙ্গনে শোকের ছায়া

দেশের আইন অঙ্গনে কয়েক দশক ধরে সসম্মানে পেশাগত দায়িত্ব পালনকারী ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধাদের মনে। সদ্য প্রয়াত রাষ্ট্রের সাবেক সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার কর্মময় জীবনের কথা স্মরণ করে তারা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয় নিয়ে তিনি আদালতকে সবসময় সহযোগিতা করেছেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যারিস্টার রফিক-উল হক একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন।

শনিবার সকাল সাড়ে আটটায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে মারা যান দেশবরেণ্য এই আইনজীবী।

তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, একাধিক প্রতিমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।

শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ছিলেন বাংলাদেশের আইন অঙ্গনের এক নক্ষত্র। তিনি দেশের অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবী ছিলেন। নিজকর্মগুণেই বিজ্ঞ এই আইনজীবী দেশের মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার মৃত্যুতে দেশের আইন অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো।

শোক প্রকাশ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এদেশের আইন অঙ্গনের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাসহ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় তার অনবদ্য অবদান জাতি দীর্ঘকাল স্মরণে রাখবে।

এদিকে আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের অবদান অনস্বীকার্য বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। শোকবার্তায় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ছিলেন প্রথিতযশা আইনজীবী। অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয় নিয়ে তিনি আদালতকে সবসময় সহযোগিতা করেছেন। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যারিস্টার রফিক-উল হক একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য।’

শোক প্রকাশ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘তার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। তাকে শ্রদ্ধা জানাতে জানাজা সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে করার ব্যবস্থা করা হবে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন আমার সিনিয়র। আমার বড় ভাই। আইন পেশায় যেকোনো প্রয়োজনে তিনি আমাকে সাহায্য করতেন। কোনো বিষয় বুঝতে গেলে যত্ন সহকারে তিনি বুঝিয়ে দিতেন। তার মৃত্যুতে আমি চরমভাবে শোকাহত।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে এলএলবি পাস করেন। ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্য থেকে বার অ্যাট ল সম্পন্ন করেন। ১৯৬৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে এবং ১৯৭৩ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন।

বর্ণাঢ্য জীবনে আইন পেশায় দীর্ঘ প্রায় ৬০ বছর পার করেছেন তিনি। বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে আইনি লড়াই করেন তিনি। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় বরাবরই সোচ্চার রফিক-উল হক। দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয় নিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করেছেন বর্ষীয়ান এই আইনজীবী।

১৯৯০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রফিক-উল হক। এসময়ে তিনি কোনো সম্মানী নেননি। পেশাগত জীবনে তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দল করেননি। তবে নানা সময়ে রাজনীতিবিদরা সবসময় তাকে পাশে পেয়েছেন। রাজনীতিবিদদের সম্মান সবসময়ই অর্জন করেছেন তিনি। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তার জীবনের উপার্জিত অর্থের প্রায় সবই ব্যয় করেছেন মানুষের কল্যাণ ও সমাজসেবায়।