মহাসংকটের মধ্যেই অমর একুশে গ্রন্থমেলার প্রস্তুতি শুরু

মহাসংকটে দেশের প্রকাশনাশিল্প। করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে এক প্রকার বন্ধই রয়েছে সৃজনশীল বইয়ের বেচাকেনা। গত বইমেলায় প্রকাশকরা যে বিনিয়োগ করেছিলেন, করোনার গত ছয় মাসে বই বিক্রি প্রায় বন্ধ থাকায় তা উঠে আসেনি। আর্থিক সংকটের এই প্রভাব পড়তে পারে আগামী বইমেলায়। কমে যেতে পারে বইয়ের প্রকাশনা। এমন পরিস্থিতিতে আগামী বইমেলা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন চিন্তা-ভাবনা, প্রস্তুতি।

দেশের প্রকাশনাশিল্প বইমেলাকেন্দ্রিক। সৃজনশীল বাংলা বইয়ের ৯৯ শতাংশ প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। বছরজুড়ে বই বিক্রির প্রায় অর্ধেক বিক্রি হয় ফেব্রুয়ারির বইমেলায়। প্রতিবছর বইমেলা শেষে মেলায় আসা নতুন বইগুলো ঢাকার বাইরে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন প্রকাশকরা। এ বছর বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয়। কোনো কোনো প্রকাশক কিছু বই পাঠালেও করোনার কারণে দেশজুড়ে বইয়ের দোকানগুলো বন্ধ থাকায় বিক্রি করা যায়নি। ফলে প্রকাশকরা টাকাও পাননি। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকরা। সরকার ঘোষিত ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি শেষে গত ৩১ মে থেকে অন্য সব কিছুর মতো প্রকাশনা সংস্থাগুলোর শোরুম খুললেও বিক্রি নেই। দেশে এমনিতেই বইয়ের পাঠক সীমিত। তার ওপর করোনার কারণে আর্থিক চাপে রয়েছে মানুষ, যে কারণে বই কেনা প্রায় তলানিতে নেমেছে।

বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ বলেন, “গত মার্চ মাসে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে সৃজনশীল বইয়ের বিক্রি এক প্রকার বন্ধ। মানুষ নিজের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর পর বই কেনেন। করোনাকালে সবাই আর্থিক চাপে পড়ে ‘সীমিত’ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রকাশনাশিল্পে।”

করোনাকালে দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েছে। অফিসভাড়া, গুদামভাড়া, কর্মচারীর বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। অনেক প্রকাশক গুদাম ছেড়ে বাসাবাড়িতে বই রেখে প্রতিষ্ঠান রক্ষার চেষ্টা করছেন। অনেকে কম্পিউটার ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি করে কর্মচারীর বেতন দিচ্ছেন—এমন খবরও পাওয়া গেছে। যাদের পাঠ্য বইয়ের প্রকাশনা রয়েছে, তাঁরা কিছুটা হলেও আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারছেন।

ফরিদ আহমেদের দেওয়া তথ্যানুসারে, প্রকাশনাশিল্পের সঙ্গে জড়িত ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বর্তমানে মানবেতর জীবন যাপন করছে। করোনায় প্রকাশনা খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এই অবস্থায় অনেক প্রকাশকের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পলল প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী খান মাহবুব বলেন, ‘করোনাকালে বই বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এর মধ্যে বিনিয়োগের টাকা উঠে না আসায় অনেকে পুঁজি ও সঞ্চয় ভেঙে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করছেন। এই অবস্থায় নতুন করে বিনিয়োগের টাকা কোথায় পাবেন?’ তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে আগামী বইমেলায় মানুষ যাবে কি না, গেলেও আগের মতো বই কিনবে কি না, এই আশঙ্কায় নতুন করে বিনিয়োগের সাহস পাচ্ছি না।’

এর মধ্যে আগামী একুশে গ্রন্থমেলার প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলা একাডেমি। মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ড. জালাল আহমদ বলেন, ‘আমরা বইমেলা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনের সঙ্গে কথা বলেছি। সবাই চান ঐতিহ্যবাহী বইমেলার আয়োজন হোক। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তো মেলা করা যাবে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আয়োজন করতে হবে। তাই আমরা এবার একটু আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু করেছি। ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করছি এবার কী পরিমাণ প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিতে আগ্রহী। প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অনলাইনে আবেদন করতে বলা হয়েছে।