জ্যোতির্ময়ী শেখ হাসিনা

একটি দেশ তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেই দেশের মানুষের মনে দেশাত্মবোধ গভীরভাবে কাজ করে। আর দেশাত্মবোধ বা দেশপ্রেম তখনই মন-মগজে মর্যাদা পায় যখন সেই দেশের জনগণ তার জন্মভূমির সঠিক ইতিহাস, ঐতিহ্যের চর্চা করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পঁচাত্তর পরবর্তী প্রজন্ম বারবার একটি জায়গায় প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হয়েছে, বিকৃত ইতিহাস পড়ে বিভ্রান্ত হয়েছে। পরিকল্পিতভাবেই দেশ ও দেশের মানুষকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করতে একটি শ্রেণী মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেছে।

ষড়যন্ত্রকারীরা জানে বঙ্গবন্ধুর ২৩ বছরের আন্দোলন, সংগ্রাম ছিল বাঙালির জন্য, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের জন্য। পৃথিবীর যেখানে শোষণ হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শোষিতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। মানুষ যেখানেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে, বঙ্গবন্ধু তাদের একজন হয়ে অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। শত লোভ-লালসা, মৃত্যুর ভয় দেখিয়েও বঙ্গবন্ধুকে মা-মাটি-মানুষ থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয়নি। পরাশক্তি আমেরিকা, পাকিস্তান মিলেও যখন বঙ্গবন্ধু ও বাঙালিকে ধ্বংস করতে পারেনি, তখন পরিকল্পিতভাবে ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মূল স্রোতধারা ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘গণতান্ত্রিক’ বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ছায়া সরকারের আদলে পরিচালিত করতে তৎপর হয় একটি মহল। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিচারের পথ রুদ্ধ করতে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। রাতারাতি ‘জয় বাংলা’ হয়ে যায় ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। ‘বাংলাদেশ বেতার’ রেডিও পাকিস্তানের আদলে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ হয়ে যায়। পাকিস্তানের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সংবিধান কেটে খণ্ড-বিখণ্ড করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদেরও এদেশে ফিরিয়ে এনে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

ঠিক এমনই এক ক্রান্তিলগ্নে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার করলেন। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার, স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে জনগণের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সার্বভৌম সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেদিনের সেই ঐতিহাসিক সমাবেশে তিনি ঘোষণা করেন: ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।’ সেদিন তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমার আর হারাবার কিছু নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেলসহ সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদের ফিরে পেতে চাই। আপনাদের নিয়েই আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তা বাস্তবায়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই, বাঙালি জাতির আর্থ-সামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই।’

শুরু হয় শেখ হাসিনার নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘ সংগ্রাম। দীর্ঘ ১৬ বছর সামরিক জান্তা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে চলে তাঁর একটানা অকুতোভয় সংগ্রাম। জেল-জুলুম, অত্যাচার কোনো কিছুই তাঁকে শপথ থেকে টলাতে পারেনি। বাংলার মানুষের হারিয়ে যাওয়া অধিকার ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘গণতন্ত্র’ পুনরুদ্ধার করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বারবার স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেছেন, আবির্ভূত হয়েছেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা রূপে।

দীর্ঘ ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের উন্নয়নের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের ইতিহাস রচনা শুরু হয়। প্রথমবারের মতো ১৯৯৮ সালে দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকল্পে শেখ হাসিনা সেফটি নেট কার্যক্রম শুরু করেন। গ্রহণ করা হয় ‘একটি বাড়ি একটি খামার’-এর মতো দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী কর্মসূচি। বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার মতো উদ্ভাবনী কর্মসূচিগুলোর সূচনাও ঘটে এ সময়। প্রান্তিক কৃষকের কথা চিন্তা করে শেখ হাসিনা দেশে প্রথমবারের মতো কৃষকের জন্য ১০০ কোটি টাকা প্রণোদনা দেন। নাগরিকের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে সরকারি উদ্যোগে প্রতি ৬ হাজার জনসংখ্যার জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। মোবাইল ফোন খাতের একচেটিয়া ব্যবসার অবসান ঘটিয়ে স্বল্পমূল্যে সবার কাছে মোবাইল ফোন সহজলভ্য করা হয়। বাংলাদেশকে ফাইবার অপটিক্যাল কেবলের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জামের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক কমিয়ে সরকার তথ্যপ্রযুক্তিকে জনগণের কাছে সহজলভ্য করে তোলার উদ্যোগ নেয়। যে কারণে দেশ ডিজিটাল যুগে প্রবেশের সুযোগ পায়।

অন্যদিকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তি, ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচনে বিশ্ব আঙিনায় বাংলাদেশকে মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। যে হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, সেই তিনিই ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনাকে ‘ইউনেস্কো পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সাফল্যের স্তুতি বর্ণনা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন।