করোনা, কোয়ারেন্টাইন, স্ট্রেস ও আত্মহত্যা

নিজেকে ও পারিপার্শিক সবাইকে করোনা থেকে নিরাপদ রাখতে সারা বিশ্ব জুড়ে চলছে সেল্ফ আইসোলেশন এবং কোয়ারেন্টাইন পিরিয়ড। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে সারা বিশ্বজুডে চলছে আত্মহত্যা প্রবনতা। মানুষ অল্পতে রেগে যাচ্ছে, নিজের উপর অতৃপ্তি, নিজের কাজের উপর অনীহা, কাজ চলে যাওয়া, সংসারে টানাপুডেন, সম্পর্কে টানাপুডেন, অনেকদিনের গড়া সম্পর্কগুলো ভেংগে যাওয়া, সোসাল ডিস্টেন্স মেনটেইন, স্বজনদের সাথে দেখা করতে না পারা, বন্ধু বান্ধবের সাথে দূরত্বের সৃস্টি এবং এই সময় নিজের মাঝে একাকীত্ব অনুভব করা। ফল হচ্ছে আত্মহত্যা।

THE LANCET Medical journal এ প্রকাশ হয়েছে এ বছর (২০২০) ফেব্রুয়ারীতে যেখানে King’s College London এর Psychological Medicine Department এর সাতজন রিসার্চার যারা সম্মিলিত ভাবে রিসার্চ করছেন তাদের মতে-

“Quarantine is often an unpleasant experience for those who undergo it. Separation from loved ones, the loss of freedom, uncertainty over disease status and boredom can, on occasion, create dramatic effects,”

মানুষ যখন যেখানে ইচ্ছা আগের মত বের হতে পারছেনা তাদের ইচ্ছা কিংবা প্রয়োজন থাকা সত্বেও। বের হতে পারলে ও নিয়ম মেনে চলাফেরা করতে হচ্ছে নির্দিষ্ট একটা গন্ডির মাঝে সীমাবদ্ধ থেকে। এমনকি কেউ কেউ স্বজনদের মৃতদেহটা পর্যন্ত শেষ দেখা দেখতে পারছেনা। অনেকে ঘরে বসে অফিসের কাজ করছেন, কারো আবার কাজ চলে যাচ্ছে। প্রকৃতির সান্নিধ্য থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে মানুষজন। নিজেকে অনেকটা পরাধীন ভাবা শুরু করেছে বিশেষ করে যারা সরকারের বিধিনিষেধ মেনে চলছে। ফলে তাদের মাঝে স্ট্রেস সৃস্টি হচ্ছে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দৈনন্দিন কাজের চাপকে কিন্তু স্ট্রেস বলে না বরং কোন চাপকে স্ট্রেস হিসেবে গণ্য করতে হলে সেটা একটা মাত্রা ছাড়াতে হয়। সেটা কর্মক্ষেত্রের চাপ ও হতে পারে কিংবা অন্য যে কোন চাপ। ঘরে বসে যারা অফিসের কাজ সারছেন তারা নিজেরা বোধ করছেন অফিসে গেলে সহকর্মীদের সাথে দেখা হত, কথা ও ভাবের আদান প্রদান হত ফলে নিজেকে তুলনামূলক ভাবে অনেকটা হাল্কা লাগত। কোন কোন সময় হয়ত কর্মীরা এটা ও ভাবতে পারে যে ওরা ঘরে বসে অধিক কাজ করছে, অফিসে গেলে এত বেশি কাজ হয়ত একদিনে করা লাগতনা, কাজে নির্ভুল ভাবে করার একটা চাপ হয়ত থেকে যায়, ওরা ভাবে হয়ত অফিসে থাকলে কারো কাছ থেকে সাহায্য নেয়া যেত, প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে পারছেনা মনে করছেন অনেকে। কারন বাসায় বসে কাজ করা মানে পরিবারে লোকজন যখন তখন আসবে হয়ত কাজের ফাকে বাসার টুকুটাকি কাজ ও করা লাগতে পারে ফলে সবসময় কাজের দিকে যথাযথ মনযোগের বিঘ্নতা ঘটে, লোকজন এতে বেশি প্রেসার বোধ করে। এসমস্ত বিভিন্ন কারনে মূলত স্ট্রেসের সৃস্টি হয়। ফলে ব্যক্তির নিজস্ব অনুভব ও তার আচরণ বদলে যেতে শুরু করেছ । স্বাভাবিকভাবেই তার মনে বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃস্টি হতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় স্ট্রেসকে মূলত তিনভাগে ভাগ করা যায়: মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক

স্ট্রেস এর ফলে মানসিক অশান্তি যেমন; অল্পতেই মেজাজ নষ্ট, খিটখিটে ভাবের উৎপত্তি, কাজে উৎসাহ না পাওয়া থেকে শুরু করে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া, কাজের ক্ষেত্রে ভুল করা, হাল ছেড়ে দেওয়া ভাব এমনকি নিজেকে আঘাত করা বা আত্মহত্যার চিন্তাও আসতে পারে যা সরাসরি শারীরিক বিভিন্ন আঘাতের ও কারন হয়ে দাঁড়ায়। অনেকে এই সময়টায় নিজেকে নিজে বিভিন্নভাবে আঘাত করতে থাকেন; হাত কাটা, মাথা ঠোকানো ইত্যাদি। সামাজিক ক্ষেত্রে স্ট্রেস-এর প্রভাব বোধহয় সবথেকে বেশি পড়ে। সম্পর্কে জটিলতা থেকে ক্রমাগত সম্পর্কের ভেঙ্গে যাওয়া, বন্ধুহীনতা, পরিবার ভেঙ্গে যাওয়া, অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া এবং সহজেই নেশার কবলে পড়ে যাওয়া ও ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়া আজকের সমাজে খুব একটা ব্যতিক্রম কিছু নয়। ফলে তার নিকটের যত লোকজন ছিল; পরিবার তথা বল্ধুবান্ধব ধীরে ধীরে তারা ও মুখ ফিরিয়ে নেয় এ সমস্ত লোকজন থেকে। তারপর নিজের একাকীত্ব সহ্য করতে না পেরে, নিজেকে পরিবার ও সমাজের অযোগ্য মনে করে হতাশায় ডুবতে ডুবতে আত্মহত্যাকে বেঁচে নেয় এরা শেষ সমাধান হিসেবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,”বিশ্বে প্রায় ৭ কোটি লোক বিষন্নতায় ভোগে। ৮ লাখ লোক বিষন্নতার কারনে আত্মহত্যা করে। ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারন বিষন্নতায় ভুগে আত্মহত্যা”।

এ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের কি কি করতে হবে এখন সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানসিক ও শারীরিক চাপ সামলানোর জন্য আমরা সবাই কোন না কোন উপায় বেছে নেয়ার চেষ্টা করি। অনেকেই ব্যপারটাকে এড়াতে পারেনা। কিন্তু একে এড়ানোর জন্য আমরা আমাদের প্রিয় কিংবা অপ্রিয় হলেও প্রয়োজনের তাগিদে তা করতে পারি আর সেটা হল মনকে অন্যদিকে ডাইভার্ট করা। একা একা ঘাপটি মেরে কোন এক কোনায় বসে না থেকে পরিবারের সাথে প্রচুর সময় কাটানো। পরিবারের লোকজনদের সাথে নিজের সমস্যা শেয়ার করা। আবেগ নিয়ন্ত্রন করা। আর না হলে পরবর্তীকালে সমস্যা আরো বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমরা যদি স্ট্রেসে আছি বুঝতে পারি এবং সাথে সাথে কারনটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে পারি এবং এ থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করতে পারি তবে সেটা ফলপ্রসূ হতে পারে। প্রতিটা সমস্যাকে প্রথমে পজেটিভ ভাবে হেন্ডেল করতে হবে। নিজেকে পজিটিভ সাইকোলজির মাঝ দিয়ে পরিচালনা করতে হবে কারন পজিটিভ সাইকোলজি কেবল মানুষের খামতিগুলি দূর করার চেষ্টা না করে কোনো ব্যক্তিবিশেষের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও সদর্থক দিকগুলিকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। সহজভাবে পজিটিভ সাইকোলজি-র চর্চার মাধ্যমে আমরা সকলেই নিজের মানসিক ও আত্মিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারি। এক কথায়, পজিটিভ সাইকোলজি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত সদর্থক দিকগুলি দেখতে আমাদের সাহায্য করে যা নিজস্ব সত্ত্বার উন্নতিতে যেমন; ভালোলাগা, খুশি ও আশার মুহূর্তগুলোকে খুঁজে নিতে ও সেখান থেকে ভালোকিছু করার অনুপ্রেরণা পেতে সাহায্য করে। ব্যক্তিসত্ত্বার উন্নতিতে যেমন; নিজের ভালো গুণগুলি; সাহস, সৃজনশীলতা, মৌলিক দিকগুলিকে চিনে নিতে সাহায্য করে। বৃহত্তর সমাজের অংশ হিসেবে নিজেকে দেখা যেমন; মানবতা ও জাতীয়তা বোধ, অপরকে সাহায্য করা, কর্মোদ্যোগী হয়ে নিজেকে বহু মানুষের সাথে যুক্ত করা ইত্যাদি। আর এসব গুনগুলো যখন একজন মানুষের মাঝে বিদ্যমান থাকে তখন ধীরে ধীরে তার স্ট্রেসগুলো কমতে শুরু করে। তার মাঝে প্রফুল্লতার সৃস্টি হয় এবং সে নিজেকে একজন নতুন মানুষরুপে আবিষ্কার করে। ফলে আত্মহত্যার বদলে পরিবার ও সমাজ পেতে সক্ষম হয় এক নতুন উজ্জীবিত, কায়িক এবং মানসিক পরিশ্রমী ও ইনোভেটিভ একজন নতুন মানুষ যে নিজেকে কখনো আর পরিবার ও সমাজের অযোগ্য মনে করেনা।

এছাড়া ও স্ট্রেস কমাতে

খেলাধুলা ও কায়িক পরিশ্রম করা যেতে পারে কারন সক্রিয়ভাবে খেলাধুলা করা এবং ঘাম-ঝরানো কায়িক পরিশ্রম যে শুধু শরীরের উপকার করে, তা নয়। আধুনিক বিজ্ঞান আজ বারবার প্রমাণ করে দিয়েছে যে পরিশ্রমের ফলে শরীরের অন্তর্নিহিত বিশেষ রাসায়নিকগুলি ক্ষরিত হতে থাকে। এদের মধ্যে এন্ডরফিন (endorphin) রাসায়নিকটি বিশেষভাবে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে কাজ করে যা আমাদের হাসি খুশি রাখতে ও স্ট্রেস-মুক্ত রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া ও আমরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারি যেহেতু এ মহামারীর সময় নিজেদের এবং নিজের পরিবারের সুরক্ষার কথা ভেবে আমরা ঘরবন্দি। কারন বিশ্রাম বিশেষ করে ঘুম একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আমাদের সকলেরই শরীর খারাপ হয়। উপযুক্ত এবং পরিমাণমতো ঘুম স্ট্রেস-কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ঘুমের প্রয়োজন যদিও বিভিন্ন মানুষের বিভিন্নরকম, তবে দিনে ৭-৮ ঘন্টা ঘুম আমাদের সকলেরই দরকার (চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে)।

আমরা আমাদের নিজের পছন্দের বিষয়গুলো নিয়ে দিনের অনেকটা সময় কাটাতে পারি। অনেকে আছেন বই পড়তে খুব ভালবাসেন, অনেকে গার্ডেনিং সহ আরো অনেকের অনেক কিছু। নিজেকে মানসিক ভাবে সুস্থ রাখতে হলে নিজের পছন্দের কাজ করে ও তা সম্ভব।

সবশেষে যা উল্লেখ করা অবশ্যই প্রয়োজন তা হলো পাশে থাকা বন্ধু বা পরিবারের লোকজন আমাদের স্ট্রেস-কে আয়ত্বে রাখতে অনেকটাই সাহায্য করে। শুধুমাত্র শুনবার কেউ বা কয়েকজন সঠিক লোক ও সম্পর্কের উষ্ণতা অনেকাংশেই আমাদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। সুতরাং কেউ যখন মনে করব স্ট্রেস কাজ করছে নিজের মাঝে কিংবা পরিবারের কারো মাঝে তখন ব্যপারটাকে পজিটিভভাবে হেন্ডেল করার প্রাথমিক উপায় হচ্ছে স্ট্রেসের নির্দিষ্ট কারন খুঁজে বের করা এবং পজেটিভ আলোচনার মাধ্যমে এর থেকে বের হয়ে আসার চেস্টা করা। নিজেকে পছন্দের বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ কাজের মাঝে নিয়োজিত রাখা। পরিবারের সাথে প্রচুর সময় কাটানো। এতে ও কাজ না হলে ইমেডিয়েটলি ডাক্তারের সরনাপন্ন হওয়া। এই করোনাকালে স্ট্রেসে আত্মহত্যা করে কেউ যেন আমাদের থেকে না হারিয়ে যায়। সবাই সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।

লেখক: কামরুন্নেছা সুরমা, শিক্ষিকা ও সমাজকর্মী, লন্ডন, ইউ কে