অবশেষে রিজেন্ট হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ

করোনা টেস্ট না করে ফলাফল দেয়া, লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকাসহ অন্তহীন অনিয়মের অভিযোগে রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হাসপাতালটির উত্তরা ও মিরপুরের দুটি শাখাই বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাটি।

মঙ্গলবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আমিনুল হাসান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেড, উত্তরা এবং রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেড, মিরপুর ঢাকা (উভয় বেসরকারি হাসপাতাল), মার্চ-২০২০ থেকে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিল। কিন্তু গত ৬ জুলাই র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) অভিযানে (মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে) রিজেন্ট হাসপাতাল লি., উত্তরা শাখায় (মূল শাখা) বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়ে, যা বিভিন্ন ইলেকট্রিক মিডিয়া এবং দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, ওই হাসপাতাল দুটি রোগীদের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে বিরাট অংকের টাকা আদায় করছে। অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও RT-PCR পরীক্ষার নামে ভূয়া রিপোর্ট দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া, তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও লাইসেন্স নবায়ন না করাসহ আরও অনিয়ম করেছে বলে প্রমাণিত হয়। এসব অনিয়মের কারণে এবং “The Medical Pactice & Private Clinic & Laboratories Regalation Ordinance-1982’’ অনুযায়ী হাসপাতালের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেয়া হলো।

এর আগে বেশ কয়েকটি অভিযোগে মঙ্গলবার রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয় সিলগালা করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল সকাল থেকে চলা অভিযানে বাহিনীটি একাধিক অভিযোগ পায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সেখানেও অনুমোদনহীন টেস্ট কিট ও বেশ কিছু ভুয়া রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এজন্য রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয় সিলগালা করা হয়েছে। এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এসব অপরাধ ও টাকার নিয়ন্ত্রণ চেয়ারম্যান সাহেব (রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহেদ) নিজে করতেন অফিসে বসে। এই অপকর্মগুলো রিজেন্টের প্রধান কার্যালয় থেকেই হতো বিধায়, এটি সিলগালা করা হয়েছে। পাশাপাশি রোগীদের স্থানান্তর করে হাসপাতাল দুটিও সিলগালা করা হয়েছে।’

অভিযান শেষে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, ‘রিজেন্ট হাসপাতাল ও প্রধান কার্যালয় সিলগালা করে দিয়েছি। হেড অফিসে বসেই মিথ্যা রিপোর্ট তারা তৈরি করতো। হেড অফিসে ৫/৭ দিনের স্যাম্পল এক সাথে করে ফেলে দিতো। ভুয়া রিপোর্টও পেয়েছি। অনুমোদনহীন র‌্যাপিড কিট আমরা পেয়েছি।’

এর আগে সোমবার বিকালে রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের পর র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট বলেছিলেন, ‘এসব অনিয়মের সাথে হাসপাতালটির চেয়ারম্যানই জড়িত এবং তিনি নিজেই এসব ডিল করেছেন।’

হাসপাতালটির মালিক মো. শাহেদ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন নেতা। সোমবার হাসপাতালটির আটজন কর্মকর্তাকে র‌্যাব আটক করলেও মালিককে খুঁজে পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

দেশে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা নিয়ে এটি দ্বিতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো। এর আগে জেকেজি নামক একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠার পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তার প্রমাণ পেয়ে সেটি বন্ধ করে দিয়েছিল। আটকও করা হয়েছিল কয়েকজনকে।

উত্তরায় ৫০ শয্যার রিজেন্ট হাসপাতালটিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অনুমোদন দিয়েছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। পরে ২০১৭ সালে মিরপুরেও হাসপাতালটির আরেকটি শাখা খুলে তার অনুমোদন নেয়া হয়। যদিও এসব হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ একবার উত্তীর্ণ হওয়ার পর আর নবায়ন করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর যখন কোনো হাসপাতাল করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে রাজি হচ্ছিল না তেমন পরিপ্রেক্ষিতে রিজেন্টসহ তিনটি হাসপাতালের সাথে চুক্তি করে স্বাস্থ্য বিভাগ। চুক্তির আওতায় সরকার সেখানে ডাক্তার, নার্সসহ কিছু জনবলও নিয়োগ দেয়। হাসপাতালটির করোনা রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার কথা ও পরে সরকার সেই টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল।

অভিযোগের শেষ নেই রিজেন্টের বিরুদ্ধে

হাসপাতাল সিলগালা করে দেয়ার পর র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চার হাজার ২৬৪টি স্যাম্পল রিজেন্ট টেস্ট করেছে এবং এর বাইরে ছয় হাজারের বেশি স্যাম্পল টেস্ট না করেই তারা ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে। তিনি বলেন, একই সাথে এ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ২০১৪ সাল থেকে নেই আর আইসিইউ যেটা আছে এটা নরমাল ওয়ার্ডও না। সেখানে পুরনো কাঁথা বালিশ থেকে আরম্ভ করে সব আছে। এর যে ডায়াগনসিস ল্যাব সেখানে কোনো মেশিন নেই, সেখানে কোনো টেস্ট না করেই রিপোর্ট দিয়েছে। ফ্রিজের মধ্যে এক অংশে রি এজেন্ট আর অন্য অংশে আইয়ের মাছ পাওয়া গেছে। এর যে ডিসপেনসারি সেখানে সব সার্জিক্যাল আইটেম ৫/৬ বছর আগের মেয়াদোত্তীর্ণ। এর মালিকের গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নেই।

এর আগে প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালানোর সময় তিনি বেশ কিছু রিপোর্ট ও কিট সাংবাদিকদের দেখিয়ে বলেন, দেখুন এগুলো তো হাসপাতালে থাকার কথা। অথচ এসব রিপোর্ট পড়ে আছে তাদের গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে। এসব অনিয়মের সাথে হাসপাতালটির চেয়ারম্যানই জড়িত এবং তিনি নিজেই এসব ডিল করেছেন।

সোমবার বিকালে রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালানোর পর র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, তারা হাসপাতালটি একজন কর্মকর্তার রুমে অনেক নমুনা পড়ে থাকতে দেখেছেন যেগুলো করোনা পরীক্ষার জন্য গ্রহণ করা হয়েছিল।

তবে অভিযানের আগেই করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট তৈরির অন্তত ১৪টি প্রমাণ র‌্যাব পেয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

সারওয়ার আলম জানান, হাসপাতালটি নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোর কোনো পরীক্ষা ছাড়াই পজিটিভ বা নেগেটিভ উল্লেখ করে রিপোর্ট দিতো। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভেরিফাই করে দেখেছি যে তারা এসব রিপোর্ট ওখান থেকে নেয়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চিত করেছে যে এসব নমুনা তারা পরীক্ষা করেনি এবং এসব রিপোর্টও তারা দেয়নি। বরং এসব রিপোর্ট বিশ্বাসযোগ্য করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সিল ও প্যাড নকল করে ব্যবহার করা হতো।’

আবার সরকারিভাবে যে টেস্ট বিনামূল্যে করার কথা সেগুলোর জন্যও তারা টাকা আদায় করতো। আবার রোগীর কাছ থেকে টাকা আদায় করে পরে সেটিকে বিনামূল্যে করা হয়েছে দেখিয়ে সরকারের কাছে প্রায় দেড় কোটি টাকার বিল জমা দিয়েছিল রিজেন্ট কর্তৃপক্ষ।

এমনকি যে চিকিৎসা বিনামূল্যে করার কথা সেটির জন্য রোগীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আবার সরকারের কাছ থেকেও সেই টাকা গ্রহণ করেছে হাসপাতালটি।

এদিকে অভিযানের আগে রিজেন্টের মালিক মোহাম্মদ শাহেদ সাংবাদিকদের কাছে তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তবে এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।