বাংলাদেশে আঘাত হানা সবচেয়ে ভয়াল ৫ ঘূর্ণিঝড়

আজ (বুধবার) বিকালে বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চল দিয়ে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে ঘণীভূত হয়ে ঝড়টি গত ৩ দিনে নিজের শক্তি বাড়িয়ে সুপার সাইক্লোন অর্থাৎ ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, এ সময় স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। প্রবল বেগে বাংলাদেশের উপকূলের দিকে ধেয়ে আসা সুপার ঘূর্ণিঝড় আম্পান দেশের ১৪ জেলায় তাণ্ডব চালাতে পারে। এজন্য এসব জেলায় ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদফতরের সারা দেশের ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়, আম্পানের প্রভাবে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।

এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫টি সবচেয়ে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। ওইসব ঘূর্ণিঝড়ের ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানিসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এ নিয়ে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

সরকারি তথ্যের উদ্বৃতি দিয়ে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, ১৯৬০-২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ৩৩টি বড় সাইক্লোনের ঘটনার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আবহাওয়া অধিদফতর ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরু করে ২০০৭ সাল থেকে। এর আগে একটা সময় ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনের নামকরণ হতো না।

বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৬০ সাল থেকে ২০০৭ সালে সিডরের পর্যন্ত বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়গুলোকে ‘সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বা প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০৭ সালে প্রথম স্পষ্ট নামকরণ করা হয়। ২২৩ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা এবং ১৫-২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে নিয়ে আসা সেই ঘূর্ণিঝড় ছিল সিডর যাকে সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম উইথ কোর অব হারিকেন উইন্ডস (সিডর) নাম দেয়া হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে বিবেচনা করা হয় ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়কে।

আবহাওয়া অধিদফতরের সাবেক পরিচালক শাহ আলম বলেন, সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী ছিল ১৯৭০ এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়। এরপরে তিনি সাইক্লোন সিডরের কথা উল্লেখ করেন।

১৯৭০ এর ঘূর্ণিঝড় বিষয়ে তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সবোর্চ্চ ২২৪ কিলোমিটার বেগে চট্টগ্রামে আঘাত হানা এই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ১০-৩৩ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। যে হিসেব পাওয়া যায় তাতে ১৯৭০ এর সালের প্রবলতম ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ মানুষ নিহত হয়। সে সময় ১০-৩৩ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল এবং অসংখ্য গবাদি পশু এবং ঘরবাড়ি ডুবে যায়। অনেকে মনে করেন মৃতের সংখ্যা আসলে ৫ লাখেরও বেশি ছিল।

শাহ আলম বলেন, ১৯৭০-এর সাইক্লোন থেকেই মূলত মোটামুটিভাবে মনিটর করা শুরু হয়। সেই ঘূর্ণিঝড়টা সরাসরি বরিশালের মাঝখান দিয়ে উঠে আসে। ভোলাসহ অনেক এলাকা পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

আবহাওয়া অধিদফতরের সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ১৯৮৫ সালের ঘূর্ণিঝড়টি উরিরচরের ঘূর্ণিঝড় নামে পরিচিত। এই সাইক্লোনটির বাতাসের গতিবেগ ছিল ১৫৪ কিলোমিটার। এটা অল্প জায়গায় হয়েছে ফলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি ছিল না।

তিনি বলেন, ১৯৯১ এর ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ১২-২২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের প্রবল ঘূর্ণিঝড়টিতে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ২২৫ কিলোমিটার।

শাহ আলম বলেন, ১৯৯১ সালের ২৯-৩০ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়কে আখ্যা দেয়া হয় ‘শতাব্দীর প্রচণ্ডতম ঘূর্ণিঝড়’ হিসেবে যাতে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা যায় বলে জানা যায়। যদিও বেসরকারি সংগঠনের দাবি অনেক মাছধরার ট্রলার সাগরে ডুবে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন আরও অনেকে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় এক কোটি মানুষ। এই সাইক্লোনে অনেক পানি হয়েছিল। অনেক মানুষ মারাও গিয়েছে। যদিও পূর্বাভাস ভালো ছিল, ২৭ ঘণ্টা আগে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ছয়ঘণ্টা ধরে স্থলভাগে আসে এবং তাণ্ডব চালায় এই সাইক্লোনটি।

তিনি বলেন, সাধারণত ২/৩ ঘণ্টার বেশি সাইক্লোন থাকে না। কিন্তু এটি ছয়-ঘণ্টার বেশি সময় বাতাস বইতে থাকে। ২২৪ কিলোমিটার বেগে আসা এই ঘূর্ণিঝড়ে তেলের ট্যাঙ্কার পর্যন্ত ওপরে উঠে গিয়েছিল।

ঘূর্ণিঝড় সিডরের কথা জানিয়ে আবহাওয়া অধিদফতরের সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ২০০৭ সালের ১৫ই নভেম্বর খুলনা-বরিশাল উপকূলীয় এলাকায় ১৫-২০ ফুট উচ্চতার প্রবল ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে যার বাতাসের গতিবেগ ছিল ২২৩ কিলোমিটার। জোয়ারের সময় হয়নি বলে প্লাবন কম হয়েছে, ফলে তুলনামূলক মানুষ কম মারা গেছে, কিন্তু অবকাঠামোগত অনেক ক্ষতি হয়েছে, বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। সিডরে রেডক্রসে হিসেবে ১০ হাজার মারা গেছে বলা হলেও সরকারিভাবে ৬ ছয় হাজার বলা হয়েছিল।

ঘূর্ণিঝড় আইলার কথা উল্লেক করে শাহ আলম বলেন, ২০০৯ সালের ২৫শে মে পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা প্রবল ঘূর্ণিঝড় আইলা, যার বাতাসের গতিবেগ ছিল ৭০-৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ১৯৭০ এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে।

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়

বাকেরগঞ্জের প্রবল ঘূর্ণিঝড়- ১৮৭৬ সালের ১লা নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়টি অনেকের কাছে বাকেরগঞ্জের প্রবল ঘূর্ণিঝড় নামে পরিচিত। তাতে প্রাণ হারিয়েছিল ২ লাখ মানুষ, যখন ১০ থেকে ৪৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস হয়।

১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবরের প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ ১৪৯ জন নিহত হয়। ৬.১ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস ছিল।

১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রামে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের প্রবল ঘূর্ণিঝড়

১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামে ১ অক্টোবর ২০-২২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের প্রবল ঘূর্ণিঝড়

২০০৮ সালে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস এর পূর্বাভাস দেওয়া হলেও পরে তা বার্মার উপকূলে আঘাত হানে। মিয়ানমারে এর প্রভাবে বহু ক্ষতি হয়।

২০১৩ সালের ১৬ মে নোয়াখালী-চট্টগ্রাম উপকূলে জলোচ্ছ্বাসের ঘূর্ণিঝড় ‘মাহাসেন’’

২০১৫ সালের ৩০ জুলাই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলে ৫-৭ ফুট উচ্চতার ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’

২০১৬ সালের ২১ মে বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূলে ৪-৫ ফুট উচ্চতার ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’

২০১৭ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’।

২০১৯ সালের মে মাসের শুরুতে ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ আঘাত হানে। যার বাতাসের গতিবেগ প্রতি ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ১৮০ কিলোমিটার সর্বোচ্চ উঠেছিল ২৫০ কিলোমিটার।