করোনায় সংকটে শ্রমজীবী, ধৈর্য নিয়ে মোকাবিলার আহ্বান

বছর ঘুরে আবারও এসেছে খেটে খাওয়া মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন মহান মে দিবস। এ দিবসটি আমাদের দেশের কৃষকদের জীবনে আর পাঁচ-দশটা দিবসের মতো মনে হয়। কারণ এ দিবস নিয়ে তাদের তেমন কোনো উচ্ছ্বাস নেই।

তাদের কাছে আসে নেহায়েত ৩০ এপ্রিলের পরের দিন ১ মে, সেই হিসেবে। এই দিনে সরকারি ছুটি থাকে, কিন্তু কৃষকরা জানেন না। এই দিনটা শুধুই তাদের জন্য। তাদেরকেও তাদের কাজকে সম্মান করার জন্য এই দিনের আয়োজন।

অথচ তাদের ছুটি নেই, এ দিনেও তাদের ছুটতে হয় মাঠে। ভয়াবহ ভাইরাস করোনার মধ্যেও ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে উৎপাদন চাকা সচল রাখতে হচ্ছে। ১৮৮৬ সাল। আমেরিকার শিকাগোর হে মার্কেটের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রাম হলো। সে সংগ্রাম যখন উত্তাল হয়ে উঠল, তাতে হামলা হলো, গুলি খেয়েছিল শ্রমিকরা।

সেদিন রাজপথ লাল হয়েছিল তাদের রক্তে। সেই আন্দোলনেই অধিকার নিশ্চিত হলো দিনের আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন, আট ঘণ্টা বিশ্রাম। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত এ দিবস পালিত হচ্ছে সারা বিশ্বে। আমাদের দেশেও এ দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়। দিনে দিনে কিছু কিছু করে উন্নতি হলেও এখনও আমাদের কৃষকরা তাদের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না।

ফসল ফলাতে গিয়ে একজন কৃষকের কী রকম শ্রম ও অর্থের প্রয়োজন হয় তা আমাদের জানা। এ দেশের কৃষকরা হরতাল করতে পারে না, তারা দুর্বল কণ্ঠ নিয়ে তাদের ন্যায্যমূল্য ও ন্যায্য অধিকারের আন্দোলনও জানে না। কৃষির ওপর নির্ভরশীল এ দেশে কৃষকদের দুর্দশা আর কতদিন চলবে এ প্রশ্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছেই রইল।

এখন সারাদেশের মাঠে মাঠে পুরাদমে বোরো ধান কাটা চলছে। এখন শুধু ধান কাটা নয়, উৎপাদন চলছে সবজি, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ, পাট বপন বিশেষ করে আউশের বীজতলা তৈরিসহ ব্যাপক কর্মব্যস্ততা চলছে কৃষকদের। কিন্তু তাদের পরিশ্রম থেকে যতটুকু উৎপাদন ও আয় হওয়া উচিত, তা তারা পাচ্ছে না।

করোনায় প্রভাব ক্রেতার অভাবে ক্ষেতেই পচে যাচ্ছে অধিকাংশ সবজি। এছাড়া বাজারে এখন তরমুজ পর্যাপ্ত থাকার কথা থাকলেও পরিমাণে খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। কৃষকের ফসলের লাভের অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দখলে। এর ওপর আছে বাজার দরের ব্যাপক ওঠানামা, পরিবহন জটিলতাসহ পণ্য স্থানান্তরে কালক্ষেপণের দীর্ঘসূত্রিতা, আছে উৎপাদন পর্যায়ে নানা রকমের ঝুঁকি।

এটা বলাই বাহুল্য যে, অনেক সময়ে দাম নির্ধারণ থেকে শুরু করে নানা বিষয়েই এমন বাস্তবতা তৈরি হয়, যার ফলে কৃষকের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যা বিভিন্ন সময়ের পত্রপত্রিকাতেও এসেছে। এমনকি বাম্পার ফলনের পরেও কৃষকের লাভ করা তো দূরের কথা উৎপাদন খরচই উঠে আসে না।

অথচ কৃষকরা ঋণ গ্রহণসহ নানা প্রতিক‚লতাকে মোকাবিলা করে উৎপাদন করে, তার পরেও যদি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি মনে করি এই ধরনের যে কোনো বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে সরকারকে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা সমীচীন, যেন কৃষকরা বিপর্যস্ত পরিস্থিতিকে মোকবেলা করে আবারও ফসল উৎপাদনে নেমে পড়তে পারে।

একটি বিষয় স্পষ্ট করে বুঝতে হবে, শুধু কৃষিতে ভর্তুকি, সার, বীজ সরবরাহ করলেই হবে না, একইসঙ্গে কৃষিপণ্য উপযুক্ত মূল্য যেন কৃষক পায় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কৃষক কৃষিকাজ করে যে খাদ্যশস্য উৎপাদন করে তা থেকে যদি সে লাভবান হয় তাহলেই কৃষি উৎপাদন বাড়বে। তাই দেশে যথাযথ খাদ্যের সংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে হবে।

আর তাদের বাঁচাতে হলে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়াতে হবে এবং এ ভর্তুকি যাতে প্রকৃত কৃষক পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কৃষক তার মেধা ও শ্রম দিয়ে উৎপাদন করে দেশের সামগ্রিক গতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কৃষকের অধিকার খর্ব হলে তার চেয়ে পরিতাপের আর কিছু হতে পারে না।

দেশে কৃষি ও কৃষককে কেন্দ্র করে প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের কৃষক সংগঠন রয়েছে। এ সংগঠন কৃষককে কেন্দ্র করে গঠন করা হলেও রাজনীতির মূলধারা থেকে প্রান্তে ঠেলে দেয়া হয় কৃষি ও কৃষকের স্বার্থকে। বরং দলীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকে এ সংগঠনগুলো। যদিও করোনা কালীন কৃষক লীগ, ছাত্র লীগ বিভিন্ন সংগঠন কৃষকদের ধান কাটার সহযোগিতা করছে। যা প্রশংসনীয়।

আসলে আশির দশকে ক্ষেতমজুর আন্দোলনের পর কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। আজও কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেয়ে জমিতে আগুন দিচ্ছে। দুধ পানিতে ফেলে দিচ্ছে। সবজি রাস্তা ফেলে প্রতিবাদ করছে। এভাবে অধিকারহীন কৃষকরা আজ অসংগঠিত, অসহায় ও ভাষাহীন।

শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পে আমরা দেখেছি, গ্রামের জমিদার ও পুরোহিতদের অত্যাচারে গরিব চাষি গফুরের মেয়ে আমিনার হাত ধরে রাতের অন্ধকারে গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে যাত্রা করতে বাধ্য হয়েছিল। ভূমি থেকে উৎখাত হওয়ার পর কৃষকের এই যে করুণ অবস্থা, তা থেকে এ দেশ আজও মুক্ত হয়নি।

আমরা যদি বর্তমানে কৃষকদের বাজার ব্যবস্থা দিকে নজর দেই তাহলে দেখব দেশে এক এক বাজারে পণ্য মূল্য এক এক ধরনের। কোথাও টমেটো কেজি ২ টাকা, আবার সে টমেটো রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা। কোথাও মরিচের কেজি ৫ টাকা, আবার একই সময় এ মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা।

এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কৃষকদের জন্য সুসংগঠিত কোনো বাজার ব্যবস্থাপনা আজও গড়ে ওঠেনি। কৃষক স্বতন্ত্রভাবে তাদের পণ্য বিপণন করতে পারছে না। এতে প্রত্যেককেই আলাদাভাবে বাজার খুঁজতে হচ্ছে, বাজারে সেসব পণ্য নিজেদেরই পরিবহন করে নিয়ে যেতে হচ্ছে, নিজেদেরই বিক্রির জন্য চেষ্টা করতে হচ্ছে ও বিক্রির পর টাকা পাওয়ার জন্য ধরনা দিতে হচ্ছে।

এতে প্রত্যেকেরই সময়, শ্রম ও পরিবহন খরচ বেশি লাগছে। উৎপাদন পর্যায়ে স্বতন্ত্র কৃষকের উৎপাদনকে উৎসাহিত না করে দলগতভাবে কৃষি পণ্য উৎপাদনে সম্পৃক্ত করতে পারলে কৃষি পণ্যের উৎপাদন বাড়বে, মান বাড়বে, খামারে যান্ত্রিকীকরণের ফলে শ্রমিক ব্যয় ও অন্যান্য খরচসহ উৎপাদন ব্যয় কমবে ও নিয়ন্ত্রিত উৎপাদনের মাধ্যমে বাজার সংযোগ সহজ হবে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য যাতে কৃষক গ্রুপের বা সংগঠনের মাধ্যমে বিপণন বা রফতানি করা যায় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। কেননা, বাংলাদেশ এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, আম, সবজি এসব রফতানিতে সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের মান এবং সুনাম ধরে রাখতে পারে বাংলাদেশেরই বিশ্বস্ত কৃষক ও কৃষক সংগঠন। সময় এসেছে কৃষকবান্ধব ব্যবসা চালু করার।

কৃষক বাঁচলে তবেই বাঁচবে দেশ, মিটবে মানুষের খাদ্যের অভাব। রাষ্ট্রকে নানামুখী অর্থনৈতিক ভর্তুকি এবং প্রণোদনা দিয়ে বাঁচাতে হবে আমাদের দেশের কৃষি শিল্পকে, আর বাঁচিয়ে রাখতে হবে এদেশের উজ্জ্বল সন্তান কৃষকদের। নয়তো খাদ্যের তীব্র সংকটে নাজেহাল হবে দেশ।

করোনাকাল ও করোনা-পরবর্তীকালের অর্থনৈতিক ভিত্তি হবে কৃষি, অন্তত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে- এ সত্য বুঝতে বাংলাদেশের আর সময় নেয়া উচিত হবে না। যদি বাংলাদেশের কৃষকের স্বার্থ রক্ষা না হয় তবে তার সার্বিক ফলাফল কোনোভাবেই ইতিবাচক হওয়া সম্ভব নয়। তাই কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: মো. বশিরুল ইসলাম- শিক্ষক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।