করোনায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের প্রধান দুশ্চিন্তা বাসাভাড়া

সাড়া বিশ্বেই চলছে চীন থেকে ছিড়য়ে পড়া করোনাভাইরাসের আক্রমণ। এই অবস্থায় দেশের সব স্থানেই লকডাউনে রাখা হয়েছে। এতে রাজধানীর বসবাসকারী মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের মোট আয়ের ৬০ থেকে ৭০ ভাগই চলে যায় বাসাভাড়ার পিছনে। বছর ঘুরলেই যেন নতুন আতঙ্ক, বাড়িওয়ালার নোটিশ ‘এ মাসে আপনার (এত) টাকা বাসাভাড়া বাড়ানো হয়েছে।’ কিছুই করার নেই, মাথাগোঁজার জন্য মুখ বুজে সহ্য করতে হয় সব। এর মধ্যে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে কার্যত পুরো দেশই লকডাউন।

রোজগার বন্ধ নিম্নআয়ের মানুষের। তিনবেলা দুমুঠো খাবারের জন্যই হাহাকার ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে। এমন অবস্থায় বাসাভাড়া পরিশোধ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। তাই নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের দাবি, নির্বাহী আদেশে সরকার অন্তত দুমাসের জন্য হলেও বাসাভাড়া মওকুফের ঘোষণা করুক। এ ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালাদের জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির দাম মওকুফ করলে তারাও মানবিক কারণে বাড়িভাড়া না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকাতেই প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে নিজস্ব ফ্ল্যাট বা বাড়ি রয়েছে মাত্র ৫ থেকে ৭ ভাগ লোকের। বাকিদের প্রতিমাসে আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই ব্যয় হয় বাসাভাড়ার পিছনে। অনেকে সেই ব্যয় বাঁচাতে পরিবারকে গ্রামে রেখে জীবিকার তাগিদে রাজধানীতে একাকী

জীবনযাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছেন রিকশা, ভ্যান, অটোচালক; নিম্নআয়ের শ্রমজীবী; গরিব অসহায় ব্যাচেলর, যাদের পড়ালেখাসহ বাসাভাড়া নির্ভরশীল টিউশনির ওপর। এ মানুষগুলোর জীবনের চাকা ঘুরে অনেকটা প্রতিদিনের আয়ে, কারও চলে সপ্তাহের রোজগারে। করোনা ভাইরাসের কারণে ওই মানুষগুলোর রোজগারের সব দরজা আপাতত বন্ধ। ঘরবন্দি হয়ে কর্মহীন জীবনযাপন করছেন তারা। ভালো নেই মধ্যবিত্তরাও।

রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক সিফাত আনজুম। দুই সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন লালবাগে দুই রুমের একটি ফ্ল্যাটে। তার জন্য প্রতি মাসে ভাড়া গুনতে হয় ১৮ হাজার টাকা। তবে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গত মাসের শুরুতেই স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে এ মাসের বেতন কবে পাবেন তা অনিশ্চিত। ইতিমধ্যে দুমুঠো খাবার জোগাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে এ মধ্যবিত্তকে। নতুন করে দুশ্চিন্তা বাসাভাড়া। সিফাত বলেন, ‘সরকার চাইলে বাসাভাড়া মওকুফ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাড়ির মালিকদেরও সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনে সুবিধা দেওয়া হোক। এ মুহূর্তে সংসার চালাতেই পারছি না। বাসাভাড়া দেব কী করে?’

একই কথা বললেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শওকত নাবিল, ‘দোকান বন্ধ কয়েকদিন ধরে। মাঝে মধ্যে খুলতে পারলেও বিক্রি নেই। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু এখনতো বাসাভাড়া দেওয়ার সময় হয়েছে। সরকার যদি কোনো সিদ্ধান্ত না দেয়, তা হলে একেবারে পথে বসতে হবে। আমাদের তো ব্যাংকেও কোনো টাকা নেই যে, তুলে দিয়ে দেব।’

ইতিমধ্যে বাসাভাড়া মওকুফের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করেছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। আগামী তিন মাসের দোকান ও বাড়িভাড়া মওকুফ চেয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেছেন সংগঠনের সদস্যরা। দাবি না মানা পর্যন্ত তারা এ কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। মঞ্চের কেন্দ্রীয় সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল আমাদের সময়কে বলেন, ‘মধ্যবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষ সংসার চালাতেই পারছে না। সেখানে মাস শেষে বাসাভাড়া নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা চাই সরকার আগামী তিন মাসের বাড়িভাড়া মওকুফের ঘোষণা দিয়ে জনমনে শান্তি ফিরিয়ে আনুক। প্রয়োজনে বাড়ির মালিকদের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিলও মওকুফ করুক। এ দাবি না মানলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচি দেব। লকডাউন শিথিল হলে দাবি বাস্তবায়নে প্রয়োজনে সমাবেশ করব।’

করোনা ভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাড়িভাড়া মওকুফের দাবি জানিয়েছে ভাড়াটিয়া পরিষদও। সংগঠনের সভাপতি মো. বাহারানে সুলতান বাহার আমাদের সময়কে বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে অনেকেই কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সেখানে বাসাভাড়া পরিশোধ করে জীবন চালানো তাদের জন্য দুরূহ ব্যাপার। দেশের এ ক্রান্তিকালে বাড়িওয়ালাদের উচিত মার্চ, এপ্রিল ও মেনে এ তিন মাস বাসাভাড়া না নেওয়া। সরকারেরও উচিত দেশের এই ক্রান্তিকালে নিম্ন আয় ও খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আমরা চাই বাসাভাড়া মওকুফের বিষয়ে সরকার একটি সিদ্ধান্ত নিক।’

এ দিকে বাসা-বাড়ির গরিব মালিকদের এক মাসের পানির বিল মওকুফের ঘোষণা দিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ ঘোষণা দিয়ে মালিকদের প্রতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর এক মাসের বাসাভাড়া মওকুফের আহ্বান জানান তিনি। একইভাবে ভাড়াটিয়াদের জন্য বাসাভাড়া মওকুফের আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। বাড়ির মালিকদের প্রতি তিনি বলেন, ‘আমাদের শহরের নিম্নআয়ের মানুষ বস্তি বা অন্যান্য এলাকায় বাসাভাড়া নিয়ে থাকেন। করোনা ভাইরাসজনিত দুর্যোগের কারণে বস্তির নিয়ন্ত্রক বা বাড়িওয়ালাদের আহ্বান জানাব, এ দুঃসময়ে বাড়িভাড়া মওকুফের জন্য। এতে বাড়িওয়ালা বা বস্তির ঘরের মালিকরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষরা অনেক বেশি লাভবান হবেন। এ দুর্যোগের সময় তারা কোনো রকম টিকে থাকার বড় সুযোগ পাবেন।’