শেষের কবিতা :যেখানে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন

শুরুতেই বলে নিচ্ছি আমি এখন পর্যন্ত নিজেকে সাহিত্যপ্রেমী বলে গর্ব করার মতো পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি। গল্প বা উপন্যাস যা পড়েছি তার পরিমাণ খুব বেশি না। কী পড়লাম আর পড়ার পর কী বুঝলাম এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো ‘শেষের কবিতা’র মতো একটি ক্ল্যাসিক্যাল উপন্যাস পড়তে হয় ধরে ধরে, এককথায় পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে। কোনো একটি অংশ বুঝতে না পারলে পেছনে ফিরে আবার ওই অংশটুকুও পড়ে নিতে হয়—যেটি আমাকে বারবার একরকম বাধ্য হয়েই করতে হয়েছে। এই উপন্যাস-পুস্তকটি কেউ একজনের থেকে উপহার পাই এবং তিনি বলে দিয়েছেন আমি যেন এটি পড়ি এবং পড়ে আমার কেমন কী মনে হলো সেটি তাকে বলি। অবশ্য তিনি জানেন সাহিত্যে আমার তেমন মন বসে না। তবে অন্তত তার সম্মানে হলেও কিছুটা মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছি এই শেষের কবিতায়, কিছুটা মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছি সাহিত্যে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক। যে বিজয় তাঁর হয়েছিল ১৯১৩ সালে ইংরেজিতে ‘সং অফারিংস’ কাব্যগ্রন্থের জন্য। কিন্তু যদি তাঁর নোবেল পুরস্কারকে বাদ দিয়েও চিন্তা করা হয় তাহলেও কোনোভাবেই বাংলা সাহিত্যে রবি ঠাকুরের অবদান অস্বীকার করার সাহস কারো নেই বা কোনো যুগে কেউ তা করতেও পারবে না। বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তিনি বিচরণ করেননি একমাত্র মহাকাব্য ছাড়া। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, গান ইত্যাদির প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর আসন পাকা করে তবেই ইহলোক ত্যাগ করেন।

রবি ঠাকুরের যত অমর সৃষ্টি রয়েছে ‘শেষের কবিতা’ তার অন্যতম। শেষের কবিতা একটি উপন্যাস হলেও একটি সময় গেছে যখন অনেকেই একে কবিতার বই মনে করতেন; আমিও যে মনে করতাম না সেটিও বলছি না। তবে কবিতা ছাড়া যে শেষের কবিতা মূল্যহীন আর কবিতাই যে হলো এই উপন্যাসের প্রাণ তা বলে নিতে ভুল করা উচিত নয়। এতে থাকা কবিতাগুলোকেও একটু বুঝে পড়ার চেষ্টা করেছি, অথচ কবিতায় আমার মন না বসাটাই স্বাভাবিক।

শেষের কবিতা উপন্যাসটি লেখা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কালীন অভিজাত ও শিক্ষিতসমাজের গুটিকয়েক সাহিত্যপ্রেমী বিশেষ করে কবিতাপ্রেমীদের নিয়ে। এখানে আমরা যে চরিত্রগুলো দেখতে পাই সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চরিত্র হলো আমিত রায়, লাবণ্য, কেতকী, শোভনলাল ও যোগমায়া।

অমিত রায় বিলেতে পড়াশোনা করা একজন ব্যারিস্টার। ব্যারিস্টার হলেও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসায় কোনো কমতি নেই। ইংরেজিতে অমিট্রে বা অমিট রে হয়ে যাওয়া এই মানুষটির মনে প্রেমেরও কমতি নেই। আশপাশে কতশত সুন্দরী ঘোরে ফেরে কিন্তু তাদের তার মনে ধরে না। এতটুকু জেনেছিলাম প্রথমে। পরক্ষণেই রবি ঠাকুর আমাদের জানান, অমিত সময় কাটাতে শিলং যায় এবং সেখানে যাত্রাপথেই পাহাড়ের রাস্তায় কোনো এক নয়নাভিরাম স্বর্গীয় স্থানে দুই দিক থেকে আসা দুই গাড়ির সংঘর্ষ হয়। গাড়িদুটোর একটিতে ছিল বিশেষ একরকম অপুর্ণতায় ভোগা অমিত। এই সংঘর্ষে কারো প্রাণ না হারালেও কিংবা বিশালাকার ক্ষতি না হলেও অমিতের মন হারিয়ে যায় বিপরীত দিকের গাড়িতে যাত্রী হয়ে থাকা মায়াবতী লাবন্যতে। এবং লাবন্যের মনেও নতুন কিছু একটার জন্ম নিয়েছিল। যা বুঝতে পারি অমিত ও লাবন্যের প্রথম দেখার প্রথম আলাপের বিশেষ রকম এক অভিব্যক্তির দ্বারা। অমিত যখন ভদ্রতা প্রদর্শন করে দুঃখ প্রকাশ করল তখন লাবন্য অনেকটা এরকমই বলল—ভুল আসলে অমিত করেনি, ভুল করেছে লাবন্য। আর এই ভুল বা ত্রুটি সম্পর্কে যে অপ্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দাঁড় করাল লাবন্য তাতেই মনে হয় হঠাত্ উদয় হওয়া পরদেশি সূর্যকে আলো ছড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

অমিত ও লাবন্যের ভালোবাসা নামক অদৃশ্য বস্তুটি পৌঁছে গভীরতর কোনো একখানে। তারা তাদের নিজস্ব আলাপের সময় কী নামে ডাকবে সেটিও ঠিক করে নিয়েছে যা আমার কাছে এক প্রকারের ছেলেমিই মনে হয়েছে। অবশ্য প্রেমের কাছে কী ছেলেমি আর কী বয়সানুপাতিক আচরণ, এগুলো ঠিক হিসাবে ধরা হয় না। লাবন্য হলো বন্যা আর অমিত হয়ে গেল মিতা। এই নামের আগমন ঘটাতে গিয়ে লেখক এক ন্যাকামোধর্মী বা একদমই তুচ্ছমাত্রার কথোপকথন আমাদের উপহার দিয়েছেন। কেউ কেউ এখানে বলতে পারেন আমি বোধহয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ছোট করছি বা ছোট্ট মস্তিষ্কের আমি তাঁর সমালোচনা করছি। আসলে তা নয়, তিনি এখানে সেটিই তুলে এনেছেন যেটি এমন এক পরিস্থিতিতে হয়ে থাকার সম্ভাবনা প্রবল থাকে।

লাবন্য খুবই বিদুষী। বিদ্যার জগতে মা মরা এই মেয়েটির খুব দখল। সাহিত্যের প্রতিও অগাধ প্রেম রয়েছে তার। কেন হবে না এমন? বাবা যার পশ্চিমি কলেজের অধ্যক্ষ, যে মেয়ে নিজের ঘরেই পেয়েছে লাইব্রেরি নামক স্বর্গ সে মেয়ে যে বিদ্যার্জনে পিছিয়ে থাকবে না সেটি অন্তত আমাদের মতো অসাহিত্যপ্রেমীও বুঝতে পারি। বাবা অবনীশ দত্ত খুব করে চাইতেন মেয়ে বিদ্যায় বড়ো হয়ে উঠুক, লাবন্যের বিয়ে নাই বা হলো তাতে বাবার কিছু আসে যায় না বরং চায় কন্যা তার পাণ্ডিত্যের সঙ্গে জীবন কাটাক। নিজ মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা থেকে শ্যাম-সুন্দরী মেয়েটি বঞ্চিত হলে যোগমায়া মাসীর আদর অনেক কিছু দিয়েছে।

অমিত ও লাবন্য দুজন দুজনের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছে, একসঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, প্রকৃতি দেখছে; আবার সুযোগ পেলে এটিও আন্দাজ করে নিচ্ছে কে কার মধ্যে কতটুকু ডুব দিয়েছে বা দিতে পেরেছে। কে কার মধ্যে কতটুকু ডুবেছে সেটি নিয়ে আমি পাঠক হিসেবে ততটা না বুঝতে পারলেও, অন্তত চরিত্র দুটি যে একজন অপরজনকে কথার বানে ভাসিয়ে গেছেন নদী থেকে সমুদ্রে সেটি দৃষ্টি এড়ায়নি। লাবন্যকে বিয়ে করবে এমন আশা দিয়ে অমিত আংটি পরিয়ে দেয়। খুব সাধারণ ও পাগলপ্রায় জীবনধারণ করা শুরু করে সে যা কাছে থেকেই প্রত্যক্ষ করে যোগমায়া মাসী।

ধরেই নিয়েছিলাম ‘সুন্দর একটি প্রেম’-এর গল্প শেষ করতে চলেছি। কিন্তু সেই প্রত্যাশা মাটিচাপা দিয়ে ঔপন্যাসিক নিয়ে আসলেন কেতকী ও শোভনলাল নামক দুটি চরিত্র। স্বভাবগত দিক থেকে শোভনলাল এবং লাবন্য একই রকম। কোনো এক সময় শোভনলাল লাবন্যকে প্রেম নিবেদন করে। কিন্তু সে নিবেদনে লাবণ্যর ইতিবাচক ইশারা পর্যন্তও পায়নি বেচারা। অমিত এবং কেতকীরও একই ব্যাপার। একই ব্যাপার বললে বরং আমারই ভুল হবে। কেতকী, যাকে আমরা কেটি নামেও পেয়েছি, সে অমিতকে প্রচণ্ড রকম ভালোবাসে। যখন সে জানতে পারে পাহাড়ে এসে নতুন এক মেয়ের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়েছে তার প্রেমের পুরুষ তখন সেও চলে আসে এখানে আর স্বাভাবিকভাবে যা হবার তা-ই হয়েছে; বরং অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটিয়ে দেখাননি—যিনি এই উপন্যাসের লেখক। এই কেটি বাংলার মেয়ে হলেও চলনে রয়েছে বিলেতি ছায়া। ধূমপান, কুকুরপোষা, ছোট পোশাক, তাচ্ছিল্য করে কথা বলা ইত্যাদি তার চরিত্রের অংশ। এখানেই লাবণ্যের সঙ্গে অমিল কেতকীর। বিলেতে পড়াশোনা করা এই মেয়েটি আবার অমিতের বোন লিসির বান্ধবী। ভালোবেসে অমিত এই মেয়েটিকেও আংটি পরিয়েছে; যা লাবণ্যের কাছে গোপন করে। শুধু গোপনই করে না, লাবণ্যকে স্বপ্নও দেখায়।

অমিত যেখানে একজন কেতকীর মতো রঙিন জগতের মেয়েকে ভালোবেসেছে সেখানে লাবণ্যের মতো শহুরে রঙঢঙহীন ও সমাজের চোখে শালীন একটি মেয়েকে পুনরায় ভালোবেসে কীভাবে আংটি পরায়, এখানে এই পুরুষ চরিত্রটির প্রেম বা ভালোবাসা নিয়ে কি প্রশ্ন তোলা যায় না? সত্যিকারের প্রেমিক কতবার কতজনের সঙ্গে প্রেমে জড়াতে পারে? প্রথম প্রেম ছিল বিলেতি বাংলা মেয়ের সঙ্গে আর দ্বিতীয় প্রেম হলো এক খাঁটি বাঙালি মেয়ের সঙ্গে। প্রথম প্রেমিকা ছিল খুবই খোলামেলা ও ইউরোপীয়দের দ্বারা সংক্রমিত আর দ্বিতীয় প্রেমিকা হলো চিরাচরিত বাংলা বুকের মেয়ে বলতে যা বোঝায় ঠিক সেরকম। হয়তো অমিত মনে মনে এমন কোনো মেয়েকেই জীবনসাথী হিসেবে পেতে চেয়েছিল বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালি মেয়েদের কদর বোঝানোর জন্যই অমিত চরিত্রটির জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুটির কোনোটিরই প্রতিষ্ঠা লক্ষ করা যায়নি; না দেখা গেল অমিতকে লাবণ্যের কাছে থাকতে, না দেখা গেল রবি ঠাকুরের বাঙালি মেয়ের মর্যাদার প্রতিষ্ঠা। উল্টো নারীর ওপর পুরুষের ইচ্ছে-অনিচ্ছের প্রাধান্য রেখেই নিজের দায়িত্ব সেরেছেন।

অমিত চলে যায় পুরনো প্রেমিকা কেতকীর কাছে। আর তখনই লাবণ্যের মনে হয় শোভনলালও তাকে খুব ভালোবাসে, কিন্তু বেচারাকে নিজের বিদ্যার অহংকারে পড়ে পাত্তা দেয়নি এতদিন। ফলাফল যা হবার তা-ই হলো, যা বলে দেবার প্রয়োজন মনে করছি না।

অমিতকে দেখা গেল এক বিশেষ মন্তব্য করতে, ‘কেতকীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালোবাসারই, কিন্তু সে যেন ঘড়ায় তোলা জল—প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যের সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা, সে রইল দীঘি, সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে’। কেতকী ও লাবণ্যকে নিয়ে করা অমিতের এই মন্তব্য আমার কাছে লম্পটের বাণীই মনে হয়েছে। আহ ঠাকুর! নারী নিয়ে তুমি ভালোই খেলেছ!

১৯২৮ সালে রচিত এই উপন্যাসে একটু পরপরই ছিল কবিতার খেলা। শুধু কবিতার খেলায় বা কবিতার ছটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেকেও প্রতিষ্ঠা করার অহেতুক চেষ্টা করেছেন এখানে। আমি মাঝে মাঝেই মজার ছলে বন্ধুদের কাছে নিজের ঢোল নিজেই পিটিয়ে থাকি এবং তৈরি হওয়া বিশেষ কৌতুকাবহ পরিবেশটি আমি উপভোগও করি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথও যে এই কাজটিই ভালোবাসতেন সেটি শেষের কবিতা না পড়লে জানতামই না। তিনি বারবার নিবারণ চক্রবর্তী নামে একজন কবির সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে চলেছিলেন পুরো উপন্যাসে। এবং শেষে এসে তো মূল আসনে নিজেকেই বসিয়ে গেলেন। মনে হলো শেষের কবিতার মূল উদ্দেশ্যই হলো কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথে ঠাকুরকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করার ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই প্রয়োজনহীন প্রচেষ্টা, অথচ ১৫ বছর আগে এই ব্যক্তিই নোবেল পেয়েছিলেন।

লেখকের যতগুলো কালজয়ী উপন্যাস রয়েছে শেষের কবিতা তার অন্যতম, এ আমি ইতিহাস থেকে জানি। আমার কাছেও মন্দ লাগেনি এই উপন্যাসটি। কিন্তু কেন যেন মনে হয়েছে এই উপন্যাসটি কালজয় করতে পেরেছে শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামটির জোরেই।

শেষের কবিতা উপন্যাসের কিছু উক্তি আমার মনে ধরেছে। এর মধ্যে কিছু সমালোচনা বাদেই মেনে নেওয়া যায় যেমন—‘ফ্যাশনটা হল মুখোশ, স্টাইলটা হল মুখশ্রী’। আর কিছু বিতর্কেরও জন্ম দেয় যেমন, ‘পুরুষ আধিপত্য ছেড়ে দিলেই মেয়ে আধিপত্য শুরু করবে। দুর্বলের আধিপত্য অতি ভয়ংকর’।

জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো উপন্যাসের ছোটখাটো পর্যালোচনা করলাম। আলোচনা বা সমালোচনা যা-ই করি, মনে হলো রোমান্টিসিজম ও বাস্তবতার খুব কাছাকাছি একটি গল্প পড়তে পেরেছি। এটি পড়তে গিয়ে যা বুঝলাম এবং এটি নিয়ে যা লিখলাম তাতে আমার চিন্তাধারায় বা বোঝায় ভুল থাকতে পারে। দয়া করে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন যদি আমার এই আশঙ্কা সত্যি হয়ে থাকে। কোনোরকম চমকপ্রদ উপসংহার ছাড়াই শেষ করছি শেষের কবিতা থেকে আমার ভালোলাগার শেষের কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে—

ফিরিবার পথ নাহি;

দূর হতে যদি দেখ চাহি

পারিবে না চিনিতে আমায়।

হে বন্ধু বিদায়।