করোনা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা: ক্ষতি হলে দায় নেবে কে?

সকালে অফিস যাওয়ার পথে একদল শিশুকে মা-বাবার সাথে স্কুলে যেতে দেখি। বেশিরভাগ শিশু চোখে একরাশ ঘুম নিয়ে এই পথ পাড়ি দেয়। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু, গত এক সপ্তাহ ধরে দৃশ্যপট অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। অভিভাবকরা আগের মতই বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু চোখে একরাশ দুঃশ্চিন্তার ছাপ। এখানে চোখের কথা বললাম কারণ, এই অভিভাবকদের পুরো চেহারা দেখার সুযোগ নেই। মুখের অর্ধেকটাই মাস্ক দিয়ে ঢাকা। শুধু মা-বাবা নয়, সন্তানদেরও মুখ ঢেকে যাচ্ছে এই মাস্কের জন্য। দেশে করোনা অনুপ্রবেশ করায় অভিভাবকদের এই বাড়তি সতর্কতা।

বিষয়টি যখন এতটাই গুরুতর, তখন আমরা কি করছি? আমরা শিক্ষার মান রক্ষায় দৃঢ়তার পরিচয় দিচ্ছি। আমরা আমাদের কোমলমতি শিশুদের এই বিশ্ব মহামারীর সময়ে নিয়মিত স্কুলে পাঠাচ্ছি, যাতে তারা কোনোভাবেই শিক্ষার দৌঁড়ে পিছিয়ে না পরে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শিশুদের চেয়ে।

তবে, একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। আর সেটা হলো স্কুলগুলোতে অ্যাসেম্বলি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বটে। আমরা জানি বাচ্চাগুলো খুবই সচেতন। তারা স্কুলে গিয়ে কাউকে ছোঁবে না, হাচি এলে টিস্যু দিয়ে নাক চেপে ধরবে। অথবা স্কুল থেকে ফেরার পথে কোনো কিছু না ছুঁয়ে বাসায় চলে আসবে। কি দারুণ চিন্তা আমাদের! ভবিষ্যত প্রজন্ম নিয়ে আমাদের এই মনোভাব, বিশ্বের বুকে আমাদের মাথা উঁচু করে দেবে। কিন্তু, এই কাজ আমাদের চারপাশের কিছু মানুষকে বেজায় চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ঝড় তুলছেন এই বলে যে এই বাচ্চাগুলোকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। তারা দাবি তুলছেন বিদ্যালয়গুলো সাময়িক বন্ধ করে দেয়ার জন্য। তারা উদাহরণ টানছেন ভারত যখন অবস্থা অনুধাবন করতে পেরে নিজের সব সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে, তখন আমাদের উচিত সতর্ক হওয়া। তার একটি অংশ হিসেবে তাদের দাবি স্কুলগুলো সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া। অবশ্য, এই কথাও আলোচিত হচ্ছে পাশের দেশগুলোতে এখনও এই ধরণের সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাহলে আমরা কেন এই সিদ্ধান্ত নেব।

সমালোচকরা বলছেন বাংলাদেশের অতি সাম্প্রতিক রেকর্ড ভালো নয়। ডেঙ্গু আমাদের আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমরা কতটা আনাড়ি এই সব ক্ষেত্রে। আর, স্বাভাবিকভাবে এই সব সিদ্ধান্ত ভাবাচ্ছে আমজনতাকেও।

এবার চলি নির্বাচনের মাঠে। দেশে সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো ঢাকা-১০ আসনের উপ-নির্বাচন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা ও বন্দরনগরী তাই এখন প্রচারণায় জমজমাট। প্রার্থীরা সব ভুলে আপন করে নিচ্ছেন ভোটারদের। আর ভোটের আগে প্রার্থীদের পেয়ে, খুব আপন ভাবছে জাতি। ভালোলাগার এই চরম সময়ে তারা তাই ভুলে গেছেন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ কোলাকুলি বা হাত মেলানোর বিষয়ে যে বাঁধ সেঁধেছেন। কিন্তু, নির্বাচনের মাঠে এসব কিনা মানা যায়? মুখে রুমাল-মাস্ক বেঁধে জোরপ্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। প্রচারণায় সময় এক প্রার্থৗকে দেখলাম সকলকে করোনা সম্পর্কে সতর্ক করছেন, কিন্তু পরক্ষণে এক বাচ্চাকে কোলে তুলে দিয়ে আদর করছেন। কি আবেগঘন পরিস্থিতি।

করোনা নিয়ে চিন্তা কি এখানেই শেষ? নির্বাচনের মূল আয়োজন তো এখনো বাকি? নির্বাচনের দিন ভোটাররা কিভাবে ভোট দেবেন সে সমাধান কিন্তু এখনো হয়নি। সব জায়গায় জনসমাগম এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হলো ভোটের দিন কিভাবে লাইন ধরবে ভোটাররা? তাছাড়া সরঞ্জাম (ইভিএম বা ব্যালট) ব্যবহার করে কিভাবে ভোট দেয়া যাবে তাও চিন্তার বিষয়। এখন এই ভীতি নিয়ে যদি ভোটার কেন্দ্রে না যায়, তবে এই কম ভোট পড়ার দায়িত্ব কে নেবে? সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ভোটের হার এই চিন্তাকে আরো উসকে দিচ্ছে। কিছু লোক বিশ্বাস করেন জনগণ এখন ছুঁতো পেলে ভোট কেন্দ্রে যেতে চায় না।

সামগ্রিক বিষয়টি জনমনে একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানসূচি যদি এই জাতি পরিবর্তন করার মত দৃঢ়তা দেখাতে পারে, তবে নির্বাচন নিয়ে কেন কোন সিদ্ধান্ত এখনো আসছে না? তবে, কিসের জন্য অপেক্ষা?

নির্বাচনের মাঠ থেকে এবার খানিকটা রাজনীতির মাঠে আসা যাক। করোনার এই সময়ে আমাদের দলগলো গত কয়েকদিন ধরে বাকযুদ্ধে লিপ্ত আছে। এই দৃশ্য আমাদের দেশের জনগণের মুখস্ত। তাই এখন আর কেউ বিষয়গুলোকে আলাদাভাবে নেয় না। কিন্তু এই বাকযুদ্ধের সময়ে বিএনপির একটি কর্মসূচিতে চোখ আটকে গেল।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদকে দেখলাম রাজধানীর মহাখালীতে করোনার সতর্কতামূলক লিফলেট বিতরণ করছেন। স্বাভাবিকভাবে দৃশ্যটি ভালো লাগার মত। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় এভাবে লিফলেট বিতরণ কতটা নিরাপদ তা কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। এই লিফলেট বিতরণ করার সময় বিতরণকারী ব্যক্তি বা গ্রহণকারী যে কেউ আক্রান্ত হয়ে যেতে পারেন। আসলে রাজনীতির মাঠ দখলে করতে গিয়ে আমরা যে কতটা ঝুঁকি নিচ্ছি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

পরিশেষে শুধু বলতে চাই করোনার প্রতিরোধে আমাদের প্রস্তুতি কতটা ছিল তা ভবিষ্যত বলে দেবে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় কারণে জাতি যদি বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন হয় তবে এই দায়ভার কে নেবে? তাই আগেই সাবধান হওয়া জরুরি। সড়কে নামলে একটি জনপ্রিয় স্লোগানে প্রায় চোখ প্রায় আটকে যায়। আর তা হলো ‘সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।’ আর করোনার এই সময়ে আমাদের বলা উচিত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় শিক্ষাগ্রহণ, নির্বাচন ও রাজনীতির মাঠের চেয়ে জীবন অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী