অঘোষিত লকডাউনে নাভিশ্বাস খেটে খাওয়া মানুষের

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। প্রথম কয়েকদিন রাস্তায় কেউ বের না হলেও গতকাল সকাল থেকে রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। খাবারের যোগান না থাকায় স্বাভাবিক চলাফেরা শুরু করছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মানুষজনকে অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করতে দেখা গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অনেক এলাকায় অন্যান্য দোকানপাট খুলেছে। এই পরিস্থিতিতে করোনা সংক্রমণ আরো তীব্র ও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে শোনা যাচ্ছে যে, সরকারের ঘোষিত ছুটির সীমা আরো বেশ কয়েকদিন বাড়তে পারে। ফলে এই পরিস্থিতি যদি সামনের দিনেও চলতে থাকে তাহলে দেশে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে এই শ্রেণির মানুষের শতভাগ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

গত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর কয়েক দিন মানুষও তেমন একটা ঘর থেকে বেরোয়নি, পুলিশ প্রশাসনও মানুষকে ঘর থেকে বেরোতে নিরুৎসাহিত করেছে। কখনো বল প্রয়োগও করেছে। কিন্তু গত রোববার থেকে অনেক মানুষ বিশেষ করে নি¤œ আয়ের মানুষরা ঘর থেকে বেরিয়েছেন। পাশাপাশি সড়কে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার সংখ্যাও বেড়েছে।

বন্ধের মধ্যে চাকরিজীবীদের বিশেষ অসুবিধা না হলেও বিপাকে পড়েছেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক ও স্বল্প আয়ের ব্যবসায়ীরা। গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখাকালীন সময়ে রাজধানীর মধুবাগ এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা যখন মানুষকে ঘরে থাকার নির্দেশনা দিচ্ছিল, তখন এক রিকাশাচলককে বলতে শোনা যায়, ‘চাল-ডাল দিলে তো কেউ ঘরের বাইরে যাইত না, আমরা কি করুম, চলতে হইবো তো’।

এর আগে, দুপুর বেলা হঠাৎ করে মধুবাগ বাজারের সামনে নিম্ন আয়ের মানুষের জটলা। একপর্যায়ে একটি গাড়ির পেছনে ছুটতে শুরু করেন তারা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেই গাড়ির মালিক কিছু চাল-ডাল বিতরণ করছেন। রাজধানীর বেশকিছু এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ কেউ গরিব মানুষদের এভাবে চাল-ডাল দিয়ে সহায়তা করছেন।

পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনসহ মন্ত্রী এমপিরাও সহায়তা দিচ্ছেন। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। যার ফলে এই শ্রেণির মানুষ বাধ্য হয়ে আয়ের সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন। এমনই একজন মানুষ আরিফুল ইসলাম। তিনি মৌচাকে তোয়ালে-গামছাসহ অন্যান্য জিনিস বিক্রি করছেন। সরকারের নিষেধ সত্তেও ঘর থেকে বের হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কি করুম! পেটে খাওন তো জোগাইতে হইবো রে মা। কয়দিন ঘরে বইয়া থাকমু।’

ঢাকা মহানগরে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক ও খুদে ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই স্বাভাবিক অবস্থায় মোটামুটি ভালো উপার্জন করলেও এই ধরনের পরিস্থিতিতে তাদের আয় একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। মুদি দোকান ছাড়া অন্যান্য দোকান বন্ধ। কিন্তু মাস শেষে ভাড়া তো দিতে হবে, সঙ্গে আছে পরিবারের খোরাকি, এসব কারণে মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে বা দোকান খুলছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

করোনা ভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় অন্যান্য দেশে লকডাউন করা হলেও বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক লকডাউন ঘোষণা করা হয়নি। আবার ভারতসহ উন্নত দেশ সাধারণ মানুষহ করপোরেটদের জন্য বিশাল সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এদিকে, বাংলাদেশ সরকার শুধুমাত্র রফতানিমুখী শিল্পের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছে। এই টাকা শুধু শ্রমিকদের বেতন-ভাতায় ব্যবহার করা যাবে, এমন নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

এদিকে ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে নি¤œ আয়ের কোনো ব্যক্তি যদি স্বাভাবিক জীবনযাপনে অক্ষম হয়, তাহলে সরকারের যে ঘরে ফেরার কর্মসূচি রয়েছে, তার অধীনে সহায়তা করার ঘোষণা করা হচ্ছে। এ জন্য জেলা প্রশাসকরা প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবেন। পাশাপাশি সরকার ভাসানচরে এক লাখ লোকের আবাসন ও জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যারা আগ্রহী তারা সেখানে যেতে পারবেন।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকরা প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবেন। এছাড়া, করোনা ভাইরাসজনিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় ও অন্ন সংস্থানের অসুবিধা নিরসনের জন্য জেলা প্রশাসকদের খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এই নি¤œ আয়ের মানুষদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসা দেখেই অনুমান করা যাচ্ছে যে, এসব নির্দেশনার কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নি¤œ আয়ের মানুষরা অধিকাংশই দৈনিক ভিত্তিতে আয় করেন এবং তা দিয়েই তাদের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করেন। ফলে এতোগুলো দিন তাদের পক্ষে ঘরে বসে থাকা সম্ভব নয়। আর সরকারের পক্ষ থেকে এই শ্রেণির মানুষদের জন্য যেসব কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে তা সীমিত পরিসরে এবং বিক্ষিপ্তভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তাই সরকারকে এখনই এই শ্রেণির মানুষদের জন্য দৈনিক ভিত্তিতে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের ঘোষণা দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারের নেয়া কর্মসূচিগুলো ব্যাপকভাবে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করতে হবে। যাতে সব মানুষ তাদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারে।

এক্ষেত্রে সরকার এনজিওকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। যাতে সরকারের নেয়া কর্মসূচির তথ্য-উপাত্তগুলো সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানো যায়। সরকারকে সাধারণ মানুষের শতভাগ খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

অন্যদিকে মানুষের এই চলাফেরা বেড়ে যাওয়ায় মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে বলে মনে করেন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ডা. রুবায়ুল মোরশেদ। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে বলছে, আলাদা থাকুন ও পরীক্ষা করুন, সেখানে আমাদের দেশে তিন-চার দিনের মধ্যে মানুষের চলাচল বেড়ে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।