ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধু

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার পরিবেশ কেমন ছিল, সেই ছবি ফুটে ওঠে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার বর্ণনায়। তিনি তাঁর ‘স্মৃতির দখিন দুয়ার’ প্রবন্ধে লিখেছেন “গতকাল থেকে বারবার ঘোষণা শুনছি আজ (১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে। চারদিকে ভোর থেকে হৈ চৈ, জয় বাংলার জয়ধ্বনি। আমরা ধানমন্ডি ১৮ নম্বর রোডের এই বাড়িতে গত আট মাস ধরে বন্দি। সব সময় ঘরের ভেতর থাকতে হয়। বাইরের ধ্বনি ভেসে এলেই রাসেল পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে চিৎকার করে ওঠে ‘জয় বাংলা’ বলে।…

‘…আমরা যে বাড়িটাতে বন্দি ছিলাম তার ছাদের ওপর দুদিকে দুটো বাঙ্কার করে মেশিনগান বসানো হয়েছে। এ ছাড়া আর একটা বাঙ্কার গ্যারেজের ছাদে করা হয়েছে। বাগানের মাটি কেটে ট্রেঞ্চ খোঁড়া হয়েছে। দিনরাত গুলির আওয়াজ।…সকাল ১১টা পর্যন্ত সংবাদ পেলাম ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী ঢুকে গেছে। রাস্তায় রাস্তায় মানুষের ঢল, বিজয়োল্লাস। আমরা বাড়িতে বন্দি কয়টি প্রাণী মৃত্যুর প্রতীক্ষায় যেন প্রহর গুনছি।…ঢাকা শহর মুক্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই গাড়ি নিয়ে বাসার সামনে দিয়ে যাতায়াত শুরু করল। অনেকেই আমাদের খোঁজখবর নিতে বা বাড়িতে ঢুকতে চেষ্টা করল। কিন্তু প্রহরীরা কাউকেই প্রবেশ করতে দিল না। বরং দুপুরের পর থেকে ঐ রাস্তা দিয়ে যারাই গাড়ি নিয়ে যাতায়াত শুরু করল তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে আরম্ভ করল। এদিকে রেডিওতে সারেন্ডার করবার ঘোষণা শুনছি আর আমাদের এখানে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা ঘটছে। মা হাবিলদারকে ডেকে বললেন, ‘তোমাদের নিয়াজি সারেন্ডার করেছে, তোমরাও করো।’ ওর সোজা উত্তর ‘নিয়াজি কর সকতা হ্যায়, হাম নেহি করেঙ্গে। হামারা পাস এতনা তাগত হ্যাঁয় কে হাম এক ব্যাটালিয়ন কো রোখ সাকতা’।…

‘…১৭ ডিসেম্বর। সারারাত গুলি চালাবার পর একটু বিরতি। রমা এসে বলল, গেটে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক এসেছিল, পাকসেনারা ওদের ঢুকতে দেয়নি। হাবিলদারটা ঘুমুচ্ছে তাই রক্ষে, নইলে ঠিক গুলি চালিয়ে দিত। এর মধ্যেই দেখলাম ভারতীয় সৈন্যবাহিনী বাড়িটা ঘিরে ফেলেছে এবং পাকসেনাদের সারেন্ডার করবার জন্য চাপ দিচ্ছে। হাবিলদারকে ঘুম থেকে তোলা হলো। সে কিছুতেই নমনীয় হবে না। আমরা সব সামনের কামরায় জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে গেট খুব কাছে, অনেক বাগ্বিতণ্ডার পর পাকসেনারা সারেন্ডার করতে রাজি হলো। তবে দুঘণ্টা সময় চায়। আমরা ভেতর থেকে প্রতিবাদ করলাম। মেজর অশোক নেতৃত্বে ছিলেন। তাঁকে চিৎকার করে বললাম, ওদের যদি দুঘণ্টা সময় দেওয়া হয় তাহলে ওরা আমাদের হত্যা করবে। কাজেই ওরা যেন কিছুতেই চলে না যায়। আমাদের অনুরোধে ওরা ওদের অবস্থান নিয়ে থাকল এবং পাকসেনাদের আধঘণ্টা সময় দিল।…

‘…দরজা উন্মুক্ত। আমরা সব ঘর থেকে ছুটে বারান্দায় চলে এলাম, ওরা সব অস্ত্র ফেলে দিয়ে একে একে সারেন্ডার করে গেল। মা সঙ্গে সঙ্গে আবদুলকে হুকুম দিলেন পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে ফেলতে। পতাকাটি নামিয়ে মার হাতে দিতেই মা ওটাকে নিচে ফেলে পা দিয়ে মাড়াতে শুরু করলেন। তারপর ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে আগুন ধরিয়ে দিলেন। দুই পাশ থেকে জনতার ঢল নামল। সাংবাদিকরা ছুটে এলেন। মুক্ত হবার আনন্দের কান্নায় আমরা সবাই ভেঙে পড়লাম।’

২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের তরফে দ্রুত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার দাবি তোলা হয়। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। বলা হয়, শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি। কাজেই পাকিস্তানের কোনো অধিকার নেই তাকে বন্দি করে রাখার। ততদিনে বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বের অনেক দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে।

যুদ্ধে পরাজয়ের পর পাকিস্তানের মানুষ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ওপর চড়াও হয়। তারা ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। জনরোষে টিকতে না পেরে ১৯ ডিসেম্বর রাতে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়েন ইয়াহিয়া। ২০ ডিসেম্বর পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসেও ইয়াহিয়া চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে অন্যায়ভাবে ফাঁসিতে ঝোলাতে। বাংলাদেশকে অভিভাবকহীন করতে। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপে তার সব ষড়যন্ত্র ভেস্তে যায়।

দেশ স্বাধীনের পর সাড়ে সাত কোটি বাঙালি প্রাণপ্রিয় বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পেতে মরিয়া হয়। আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ে। পরে ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে বিনা শর্তে মুক্তির ঘোষণা দেয় ভুট্টো। সেদিন রাতে বিবিসির খবরে বলা হয়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভুট্টো করাচিতে এক জনসভায় বক্তৃতা করার আগে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমি কি মুক্ত?’ জবাবে ভুট্টো বলেন, ‘হ্যাঁ, আপনি মুক্ত, আপনি যেখানে ইচ্ছা যেতে পারেন।’ ওই দিন করাচির জনসভায় বক্তৃতাকালে ভুট্টো উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে জানতে চান, তারা শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে একমত কি না। জবাবে জনতা একবাক্যে বলে ওঠে, ‘আমরা একমত।’ ভুট্টো বলেন, ‘আমি এখন বিরাট ভারমুক্ত হলাম। শেখ মুজিবকে বিনাশর্তে মুক্তি দেওয়া হবে।’

তবে এরপরও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে গড়িমসি করা হয়। এই টালবাহানা সহ্য করবে না বলে বাংলাদেশ সরকার ভুট্টোকে হুঁশিয়ারি করে দেয়। পরে ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে পিআইএর একটি বিশেষ বিমানে করে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, আমি বেঁচে আছি। আমি সুস্থ রয়েছি।’ তখন তাঁর পরনে ছিল একটা সাদা খোলা শার্ট ও ধূসর রঙের স্যুট। পরে ওখান থেকে লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারা তাঁকে ‘ক্লারিজেস’ হোটেলে থাকার জন্য নিয়ে যায়।

১০ জানুয়ারি বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের বিশ্বস্ত মুখপাত্র বঙ্গবন্ধু রয়াল এয়ার ফোর্সের একটি ‘কমেট’ বিমানে করে লন্ডন থেকে নয়াদিল্লিতে আসেন। সেখানে পালাম বিমানবন্দরে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও অন্যান্য মন্ত্রী ও উচ্চপদের কর্মকর্তা এবং ২৪ জনের বেশি-বিদেশি কূটনীতিক তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। পরে দিল্লির প্যারেড গ্রাউন্ডে তিনি এক বিশাল জনসমাবেশে বাংলায় হৃদয়ছোঁয়া ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি ভারতের জনগণ ও সরকারকে কৃতজ্ঞতা জানান।

ওই দিন দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে দেশের মাটিতে পা রাখেন জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকে একনজর দেখার জন্য লাখো মানুষ পায়ে হেঁটে জড়ো হয়েছিল বিমানবন্দরে। বঙ্গবন্ধু সাধারণ বাঙালির চেয়ে বেশ লম্বা ছিলেন। মুখে পুরু গোঁফ। পঞ্চাশ পার হওয়া চুলে কাঁচা-পাকা রঙ। বোতাম-আঁটা উঁচু কলারের কালো রঙের স্যুট পরনে ছিল সেদিন। পরদিন ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকায় লেখা হয়

‘রূপোলী ডানার মুক্ত বাংলাদেশের রদ্দুর। জনসমুদ্রে উল্লাসের গর্জন। বিরামহীন করতালি, স্লোগান আর স্লোগান। আকাশে আন্দোলিত হচ্ছে যেন এক ঝাঁক পাখি। উন্মুখে আগ্রহের মুহূর্তগুলো দুরন্ত আবেগে ছুটে চলেছে। আর তর সইছে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এসেছেন রক্তস্নাত বাংলার রাজধানী ঢাকা নগরীতে দখলদার শক্তির কারাপ্রাচীর পেরিয়ে।’

মানুষের উত্তাল সাগর সাঁতরে চার ঘণ্টায় রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছান বঙ্গবন্ধু। পঞ্চাশ লাখের বেশি মানুষ এসেছিল সমাবেশে। জাতির জনক সেদিন মানুষের দিকে তাকিয়ে শিশুর মতো কেঁদে ফেলেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে মর্মস্পর্শী ভাষণ দেন তিনি। বলেন ‘…পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিশালায় থেকে আমি জানতাম, তারা আমাকে হত্যা করবে। কিন্তু তাদের কাছে আমার অনুরোধ ছিল, আমরা লাশটা তারা যেন বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়, বাংলার পবিত্র মাটি আমি পাই। আমি স্থিরপ্রতিজ্ঞ ছিলাম, তাদের কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে বাংলার মানুষদের মাথা নিচু করব না। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙ্গালি করে মানুষ কর নি।’ কিন্তু আজ আর কবিগুরুর সে কথা বাংলার মানুষের বেলায় খাটে না-তাঁর প্রত্যাশাকে আমরা বাস্তবায়িত করেছি। বাংলাদেশের মানুষ বিশে^র কাছে প্রমাণ করেছে, তারা বীরের জাতি, তারা নিজেদের অধিকার অর্জন করে মানুষের মত বাঁচতে জানে।”

তিনি ভারত সরকারকে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। এছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার সাধারণ মানুষের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। বলেন, “গত ৭ মার্চ এই ঘোড়দৌড় ময়দানে আমি আপনাদের বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলুন। এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রামÑএবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। আপনারা বাংলাদেশের মানুষ সেই স্বাধীনতা এনেছেন। আজ আবার বলছি, আপনারা সবাই একতা বজায় রাখুন। ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। একজন বাঙালির প্রাণ থাকতেও আমরা এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না। বাংলাদেশ ইতিহাসে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই টিকে থাকবে। বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে পারে, এমন কোনো শক্তি নেই।”

বিশ্ববাসীকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে জাতির জনক বলেন, “আজ সোনার বাংলার কোটি কোটি মানুষ গৃহহারা, আশ্রয়হারা। তারা নিঃসম্বল। আমি মানবতার খাতিরে বিশ^বাসীর প্রতি আমার এই দুঃখী মানুষদের সাহায্য দানের জন্য এগিয়ে আসতে অনুরোধ করছি। নেতা হিসেবে নয়, ভাই হিসেবে আমি আমার দেশবাসীকে বলছি, আমাদের সাধারণ মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, তা হলে আমাদের এ স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে পূর্ণ হবে না। আমাদের এখন তাই অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে, সেগুলো মেরামত করতে হবে। আপনারা নিজেরাই সেসব রাস্তা মেরামত করতে শুরু করে দিন। যার যা কাজ, ঠিকমত করে যান। কর্মচারীদের বলছি, আপনারা ঘুষ খাবেন না। এদেশে আর কোনো দুর্নীতি চলতে দেওয়া হবে না।” বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানান। জাতিসংঘের সদস্য করার ব্যাপারেও সাহায্য চান।

দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রীর

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব নেন শেখ মুজিব। ১১ জানুয়ারি সাময়িক শাসনতন্ত্র অধ্যাদেশ জারি করেন। তিনি রাষ্ট্রপতির শাসনব্যবস্থা বদলে সংসদীয় পদ্ধতি সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। ১২ জানুয়ারি সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন। রাষ্ট্রপতি হলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবদুস সামাদ আজাদ, এএইচএম কামারুজ্জামান, শেখ আবদুল আজিজ, অধ্যাপক ইউসুফ আলী, জহুর আহমদ চৌধুরী, ফণীভূষণ মজুমদার, ড. কামাল হোসেন, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত।

প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেওয়ার কিছুক্ষণ পর এক সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চান, ‘স্যার, আজকের দিনে জাতির প্রতি আপনার বাণী কী? জবাবে হাসিমুখে তিনি বলেন-

‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী

ভয় নাই ওরে ভয় নাই,

নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান

ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’

ঠিক হলো পতাকা ও জাতীয় সংগীত

১৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। বৈঠকে লাখো লাখো ঘরহারা মানুষের কথা চিন্তা করে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সুদসহ সব বকেয়া খাজনা মাফ করা হয়। এ ছাড়া জাতীয় পতাকার নকশায় সামান্য পরিবর্তন আনা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পতাকাটিই ঠিক থাকবে। শুধু মাঝখানের মানচিত্রটি বাদ দিয়ে সেখানে লাল সূর্য বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’র প্রথম দশ লাইন দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নেওয়া হয়। জাতীয় কুচকাওয়াজের জন্য নেওয়া হয় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ গানটি। জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় পশু বাঘ এবং দোয়েলকে জাতীয় পাখি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বাংলা বছরের পহেলা বৈশাখ ও ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে ২১ ফেব্রুয়ারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু ১৭ জানুয়ারি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র জমা দিতে বলেন। ২৫ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকীর কাদেরিয়া বাহিনীর ১৫ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ৩১ জানুয়ারি মুজিববাহিনী অস্ত্র জমা দেয়। সবার সামনে তখন দেশ গড়ার মহান দায়িত্ব। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে আবারও গড়ে তুলতে হবে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সবাই সে কাজেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু দেশ গড়ার সেই অগ্রযাত্রা থমকে যায় পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট কালরাতে। আমরা হারাই বঙ্গবন্ধুকে। শোকের মেঘ এসে ঢেকে দেয় বাংলার আকাশ। তারপর কত ঘাত-প্রতিঘাত পেরোতে হয়েছে নবীন দেশকে, সে কথা কারও অজানা নয়।

লেখক: সাংবাদিক ও গল্পকার।