রপ্তানির ঘোষণাতেও দাম বাড়েনি চামড়ার | |

রপ্তানির ঘোষণাতেও দাম বাড়েনি চামড়ার

চামড়ার দর বাড়াতে কাঁচা চামড়ার রপ্তানি করতে সরকারি সিদ্ধান্তের পরও দাম বাড়েনি। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এখনো আড়তে এসে প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না। উল্টো দুই চার দিন সংরক্ষণের জন্য চামড়ায় লবণ দেওয়ার কারণে আরো বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

গতকাল ঈদের চতুর্থ দিনে রাজধানীতে কাঁচা চামড়ার সবচেয়ে বড় বাজার পোস্তা ঘুরে দেখা গেছে ২০ থেকে ২৫ বর্গফুটের ছোট আকারের একেকটি চামড়া বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে আড়াইশ টাকায়। ঢাকায় লবণযুক্ত চামড়া যেখানে বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ১০ টাকা বর্গফুটে।

অবশ্য বড় গরুর চামড়ার ক্ষেত্রে দাম তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। ৪০ থেকে ৫০ বর্গফুটের চামড়ার দাম দেখা গেছে আটশ থেকে এক হাজার টাকায়। অর্থাৎ বড় গরুর চামড়ার দাম দেখা গেছে বর্গফুট প্রতি ২০ টাকা করে।

তবে পাইকারি বাজারে চামড়ার জোগান নেই। কিন্তু চাহিদা আছে। অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে চাহিদার চেয়ে জোগান কম হলে দাম বাড়ার কথা। কিন্তু সেটা হয়নি। ফলে পরিস্থিতিটা অস্বাভাবিক সেটা সহজেই বোঝা যায়।

পোস্তার চামড়ার জন্য হাহাকার আছে, প্রয়োজন আর চাহিদা মতো কিনতে পারেননি আড়তদাররা। এর কারণ, অর্থ সংকট। আড়তদাররা বলছেন, অন্যান্য বছর ট্যানারি মালিকরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও এবার সেটা করেনি। আবার তারা বকেয়া টাকাও দিচ্ছে না। আর সিদ্ধান্ত এলেও বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে এখনো যোগাযোগ হয়নি। ফলে অর্থ সংকটের সুরাহা হয়নি। রপ্তানি শুরু হলে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।

এবার কোরবানির ঈদে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে পশুর চামড়ার দর পতন নিয়ে। সরকার গরুর লবণযুক্ত চামড়া ঢাকায় বর্গফুট প্রতি ৪৫ থেকে ৫০ এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা করে নির্ধারণ করেছিল। একইভাবে খাসির চামড়া বর্গফুট প্রতি ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির ক্ষেত্রে ১৩ থেকে ১৫ টাকা ঠিক হয়েছিল। কিন্তু মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বড় গড়–র চামড়া কিনেছেন চার থেকে আটশ টাকায়। ছোট গরুর চামড়া দুই থেকে আড়াইশ টাকায়ও কিনেছেন। আর খাসির গোটা চামড়া ১০-২০ টাকায় বা ক্ষেত্র বিশেষে কেউ কিনতেই চায়নি।

কোরবানির পশুর চামড়ার টাকা গরিব মানুষদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এই দরপতনের কারণে আসলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রান্তিক সেই মানুষরা। এ কারণে ক্ষোভ হয়েছে ধুমায়িত।

তবে কেবল প্রান্তির মানুষরা, আরো বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যারা নিজের জমানো টাকা বা ধার কর্জ করে চামড়া কেনেন কিছুটা মুনাফা পাওয়ার আশায়। তারা আড়তে গিয়ে চামড়ার যে দাম শুনেছেন, তাতে প্রস্তুত ছিলেন না। গরুর চামড়া ১০০ বা ১৫০ টাকা শুনে তারা আশাহত, ক্ষুব্ধ হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা, রাস্তার ধার বা নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এই অবস্থায় প্রথমবারের মতো সরকার কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ করে দেয়। আশা করা হচ্ছিল, এই সিদ্ধান্ত বাজারে চামড়ার দাম বাড়াবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা হয়নি মোটেও। আড়তদাররা বলছেন, তাদের কাছে চামড়া কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকা নেই।

আবার দরপতনের কারণে পোস্তায় স্বাভাবিক সরবরাহও নেই। ফলে যাদের হাতে টাকা আছে, তারাও চামড়া কিনতে পারছেন, এমন নয়। কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সমিতি ‘বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস এসোসিয়েশন’ এর সভাপতি দেলোয়ার হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পোস্তায় এ বছর সেভাবে চামড়া আসেনি। দেশের বেশিরভাগ জায়গাতেই সংরক্ষণ ও  অবিক্রিত চামড়া লোকসান হয়েছে। সে কারণে সামনে চামড়া সংকটে পড়বে ব্যবসায়ীরা।’

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান মনে করেন, কাঁচা চামড়া রপ্তানির এই সিদ্ধান্ত ঈদের আগে এলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতো। কারণ, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গত বছর চামড়া কিনে লোকসান দিয়েছেন। এবার তাই তারা আর ঝুঁকি না নিয়ে কম দাম বলেছেন। ফলে ঠকেছে গরিব মানুষ, যাদের পকেটে আসলে চামড়ার পয়সা যায়।

এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘সরকারের এই সিদ্ধান্ত আগে আসলে সাধারণ মানুষ চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়ত না। মৌসুমী ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তার কারণে চামড়া কেনা থেকে বিরত থেকেছে। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত সব পক্ষই সবাই লাভবান হতো।’

রপ্তানি শুরু হলে দাম বাড়তে পারে কি না- এমন প্রশ্নে টিপু সুলতান বলেন, ‘সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা নেই। বাজার থেকে চামড়া কেনার জন্য টাকা থাকলে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা করে চামড়া কিনত। যেহেতু তাদের টাকার সংকট তাই বাজারে প্রতিযোগিতা নেই। সে কারণে চামড়া দাম বাড়ার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে করি না।’

অর্থ সংকটের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পরিশোধ না করা। লালবাগ এলাকার পোস্তায় বহু বছর ধরে ব্যবসা করেন ‘সলিমুল্লাহ চামড়া আড়ত’ এর মালিক ওবায়দুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ট্যানারি মালিকদের কাছে আমাদের কোটি কোটি টাকা বাকি পড়ে আছে। এরা আমাদের টাকা আটকে রেখেছে। যে কারণে চাহিদার তিন ভাগের এক ভাগ চামড়াও কিনতে পারিনি।’

ওবায়দুল্লাহ মতো শত শত আড়তদারের টাকা আটকে রেখেছে ট্যানারি মালিকরা- জানালেন পোস্তার এই চামড়া আড়তদার।

সংগঠনের নির্বাহী সদস্য আহমেদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের কারো কাছেই টাকা নেই। ট্যানারি মালিকরা আমাদের বহু টাকা আটকে রেখেছে। সরকার তাদেরকে যে লোন দিচ্ছে সেসব টাকাও তারা বাজারে ছাড়ছে না। বাজারে টাকার না আসলে কোনো ঘোষণাতেই চামড়ার দাম বাড়বে না।’

‘কাঁচা চামড়া রপ্তানি করার সিদ্ধান্তে হয়েছে কিন্তু বাজার থেকে চামড়াগুলো যে কিনে সংগ্রহ করা প্রয়োজন, সেটা তো কেউ দেখছে না। বাজার থেকে কেনার টাকা না থাকলে চামড়া দাম বাড়ার কোনে সম্ভাবনা দেখছি না।’