তুরাগ ‘আদি রূপে’ ফেরানোর পর উৎসব

তুরাগ নদের একটি চ্যানেল পুরোপুরি দখল হয়ে যাওয়ার পর তা উদ্ধার এবং সেখানে পুনরায় পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। দেশের প্রথমবারের মতো নদী পুরোপুর দখলমুক্ত করার পর রীতিমতো উৎসব হয়েছে সেখানে।

বৃহস্পতিবার নদের অংশটিকে নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আর এর উদ্বোধন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং উৎসব আর আবেগের জায়গা হয়ে উঠেছিল।

নদীর চেহারা নদীকে ফিরিয়ে দেয়ার আনন্দ দেখা গেছে নৌ মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে। মাঝি মাল্লার বেশে অনুষ্ঠানে যোগ দেন অনেকেই। তাদের চোখে মুখে ছিল জয়ের উল্লাস। কেউবা বাইচের নৌকা দিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন উদ্ধার হওয়া নদীর অংশে।

হাউজিং প্রতিষ্ঠান আমিন-মোমিন নদীর চ্যানেলটি দখল করে সেখানে গড়ে তোলে বিশাল আয়তনের হাউজিং প্রকল্প। চলমান উচ্ছেদ অভিযানের ১১ তম দিনে যেখানে আঘাত হানে বিআইডব্লিউটিএ। যদিও শুরুতে তাদের বাধা দেওয়া হয়। বালি ও মাটি দিয়ে ভরাট করা নদীর চ্যানেলটিতে পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রায় ৪০ ফুট পর্যন্ত ড্রেজিং করতে হয়েছে। তবে নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে অবশেষে উদ্ধার হয় জায়গাটি।

আর যখন যেখানে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক হলো এবং জায়গাটি নৌযান চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠলো তখন গান-বাজনা আর উৎসবের মধ্য দিয়ে সেটিকে বরণ করে নেয় স্থানীয়রা।

গত ২৯ জানুয়ারি বুড়িগঙ্গা নদীর খোলামোড়া ঘাট থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ। চার পর্বে পরিচালিত মোট ৫০ কার্যদিবসের উচ্ছেদের বিবরণে সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক জানান, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীর উভয় তীর মিলিয়ে সর্বমোট ১৫৭ কিলোমিটার নদী তীরভূমিতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।

এ সময় ৭২৫টি পাকা স্থাপনা, ৯৮৬ টি আধাপাকা স্থাপনা, ৩২১ টি সীমানা প্রাচীর ও অন্যান্য ২ হাজার ৭৪০টি অবৈধ স্থাপনাসহ মোট চার হাজার ৭৭২টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।

আর এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে উদ্ধার হয়েছে নদীর প্রায় ১২১ একর জায়গা।

নদী উদ্ধারে গিয়ে নদী দখলদারদের জরিমানাও করেছে বিআইডব্লিউটিএ। জরিমানা আদায় হয়েছে ১০ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। উচ্ছেদ করা মালামাল নিলামে বিক্রি করে সংস্থাটি আয় করেছে ১০ কোটি ৮২ লাখ ৩২ হাজার ৪ শত টাকা।

এই উচ্ছেদ অভিযান শেষ করে নদী দখলমুক্ত করার আনুষ্ঠানিকতা বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে চ্যানেলটি উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। সেই সঙ্গে নৌ মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিটিএসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে নিয়ে জাহাজে করে ঘুরে দেখেন প্রাণ ফিরে পাওয়া তুরাগ চ্যানেলটি।

এ সময় প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এবং প্রভাব বিস্তার করে নদী দখল করা যাবে না তা আমরা এই অভিযানের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পেরেছি।’

‘অবৈধ নদী দখল, ভূমি দখল সহ সব ধরনের দুর্নীতি এবং অপকর্মের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার জিরো টলারেন্স গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে আমরা যে আবাসন উচ্ছেদ করে দিয়ে নদীর ধারা তৈরি করেছি এর বাইরে যে সকল আবাসন এখন পর্যন্ত আছে পরবর্তীতে সেগুলো আমরা নদীর সঙ্গে যুক্ত করে ৎদেব। এটা আমাদের প্রত্যাশা আমরা একটা করব।’

শুধু ঢাকার চারটি নদী নয়, সমগ্র বাংলাদেশের নদীর নাব্যতা, দখল এবং দূষণ নিয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর যে বদ্বীপ পরিকল্পনা আছে সেই বদ্বীপ পরিকল্পনার অন্যতম একটি অংশ হচ্ছে এই নদী উদ্ধার করা।’

‘আমরা নদীগুলোকে রক্ষা করার জন্য আমাদের নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ৫২টি নদী এবং ১২ টি নদীর জন্য আলাদা আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কাজ করছে দূষণ রোধের জন্য, এছাড়াও এলজিআরডি মন্ত্রনালয়, নদী রক্ষা কমিশন সর্বদা তৎপর আছে।’

অনুষ্ঠানে নৌপরিবহণ সচিব আবদুস সামাদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী নদীর অবৈধ দখল রোধ এবং নদীর গতিপথ ফিরিয়ে দিয়ে তাকে পুনরায় সচল করা, নাব্যতা বৃদ্ধি এবং নৌপথে নাব্যতা সৃস্টি করতে যত প্রকার বাধা আছে আমরা তা সম্প্রসারণে কাজ করছি।’

‘আমাদের এই উদ্ধার অভিযান চলমান থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত একটি দখলদার থাকবে। প্রয়োজনে আমরা কোন পরীক্ষা করে জায়গা নির্ধারণ করে আমরা আবার অভিযান চালাব।’

উদ্ধার করা জায়গা বাধাই করার কাজ আগামী সেপ্টেম্বর থেকেই দৃশ্যমান হবে বলে জানান সচিব। বলেন, ‘সারা পৃথিবীতেই নদীর পাড়ে হাঁটার পথে জায়গা আছে। টেমস নদীর তীরে যান অথবা এমজি নদীর তীরে যান সেখানে দেখলে দেখবেন প্রচুর প্রশস্ত জায়গা আছে যেখানে মানুষ হাঁটাহাঁটি করে। আমরা সেভাবে ঢাকার মানুষকে নদীর পাড়ে হাঁটার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তারা যেন সকালে বিকেলে এবং সন্ধ্যায় হাঁটাহাঁটি করতে পারে সেই জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ আলোকসজ্জার ব্যবস্থা ও কবে।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, ‘আমিন মোমিন হাউজিংটি আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। এটিকে নদী বানিয়ে দেয়া, পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা চ্যালেঞ্জ ছিল। অনেক ষড়যন্ত্র ছিল, তবুও আমরা সফল হয়েছি।’

নদী দখলমুক্ত করতে যে খরচ হয়েছে তা কীভাবে আদায় হবে- এমন প্রশ্নে বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক বলেন, ‘আমরা ড্রেজিং বিভাগকে চিঠি পাঠিয়েছি। সেখানে তাদের খরচের বিবরণী আমরা চেয়েছি। ড্রেজিংয়ের ব্যবহৃত মেশিনের খরচ, তেলের খরচ, কর্মঘণ্টাসহ সকল সমন্বয় করে আমরা সেটি আদায়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা এ বিষয়ে আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছি।’

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান এম মাহবুব-উল ইসলাম, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা নদী বন্দর ও নৌ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।