বিপন্ন মনুষ্যত্ব : এই বর্বরতার শেষ কোথায়? | |

বিপন্ন মনুষ্যত্ব : এই বর্বরতার শেষ কোথায়?

এটাতো দেখি বিস্ময়ের বাংলাদেশ! কি না ঘটছে এদেশে? কত কিছুইতো দেখছি আমরা। দিন দিন যেন, বিস্ময়ের মাত্রা বাড়ছে। দেশে মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু হচ্ছে। মানুষের ভেতরকার বিবেক বোধ হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষগুলো কেমন যেন দয়া-মায়াহীন হয়ে পড়েছে। নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে। মন চায় প্রিয় দেশটা ছেড়ে পালাই। এদেশেতো অসংখ্য পশুরা থাকে। প্রকাশ্যে ওসব পশু মানুষ বধ করে। তা দেখে দিনদিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি আমরা।

সর্বশেষ বরিশালের বরগুনা সরকারি কলেজে মানুষরূপী পশু তাদের পশুত্ব প্রকাশ করলো। সেখানে কি দেখলাম আমরা? প্রকাশ্যে এক যুবককে তার স্ত্রীর সামনেই কুপিয়ে হত্যা করেছে কয়েকজন যুবক। এ ঘটনায় আক্রান্ত যুবক পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। নিহত যুবকের নাম রিফাত শরীফ (২২)। তিনি বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের মাইঠা-লবনগোলা এলাকার দুলাল শরীফের ছেলে।

স্ত্রীর সে কি আকুতি! রিফাতের স্ত্রী মিন্নি দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। স্বামীকে বাঁচাতে হামলাকারীদের হাতে পায়ে ধরেও শেষ রক্ষা হয়নি। কিছুতেই হামলাকারীদের থামানো গেল না। তারা রিফাতকে উপর্যুপরি কুপিয়ে রক্তাক্ত করে চলে যায়। বরগুনা পৌরসভার ধানসিঁড়ি সড়কের আবু বকর সিদ্দিকের ছেলে নয়ন বন্ড ও তার প্রতিবেশী দুলাল ফরাজীর দুই ছেলে রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী এবং রাব্বি আকন স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মুন্নির স্বামীর ওপর নিষ্ঠুর হামলা চালায়। ২৬ জুন বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রিফাতকে কোপায় দুর্বৃত্তরা। পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৪টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

সমাজে যেসব অপরাধ হচ্ছে তা খুবই মর্মান্তিক, বিভীষিকাময়, নারকীয় ও ভয়ঙ্কর। এ অপরাধ সভ্য সমাজের মানুষের কাছে কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধ বর্বতা ও সভ্যতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এসব বর্বরোচিত ঘটনায় আসামিরা মামলার দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে আইনত বা ন্যায়ত কোনো সুযোগ বা আদালত থেকে আসামি কোনো প্রকার অনুকম্পা বা দয়া পেতে পারে না। তবুও আইনের নানা ফাঁক ফোকরে আসামিরা পার পেয়ে যাচ্ছে। বলতেই হয়, বিশ্বজিতের রক্তের দাম দিতে হয়েছে রিফাতের প্রাণের বিনিময়ে! বিচারহীনতার সংস্কৃতির এই দেশে এভাবেই রিফাতদের চলে যেতে হয় অকালে অতৃপ্তি নিয়ে। আর আমাদের বেঁচে থাকতে হয় তাদের অভিশাপের বোঝা নিয়ে। এইতো বাংলাদেশ! সাবাশ বাংলাদেশ!

কখনো বিবেক বুদ্ধি, পরকীয়া; কখনো অর্থের তাড়নায় অহমিকাচ্ছন্ন মানুষগুলো কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে। মানুষকে প্রকাশ্যে ঠাণ্ডা মাথায় কোপানো, খুনের পর লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলা, নিজ সন্তানকে পুড়িয়ে মারা, নিজ সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন হওয়া, শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর খুন এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ।

পরকীয়ার জেরে গর্ভধারিণী মায়ের হাতে প্রিয় সন্তান খুনের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধও বেড়েই চলেছে। প্রেম ও পরকীয়ার মোহে নিজ শিশুকে পুড়িয়ে মারতেও দ্বিধা করছে না গর্ভধারিনী মা। এদিকে দাম্পত্য কলহের জেরে স্বামী খুন করছে স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে। তুচ্ছ ঘটনার জের ধরেই একের পর এক ঘটছে প্রাণসংহারের মতো ঘটনা। দুর্বৃত্ত বা সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি পরিবারের আপন মানুষটির কাছেই আরেকজন সদস্য ক্রমশ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে। প্রাণ হারাচ্ছে। সামাজিক অপরাধের লাগামহীন বৃদ্ধিতে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন।

প্রকাশ্যে শতশত মানুষের উপস্থিাতিতে বরগুনায় ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিনা আমরা। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। রাজধানী ঢাকায় নিহত দর্জি দোকানের কর্মী বিশ্বজিৎ দাস হত্যার চেয়েও বরগুনার ঘটনাটি বর্বরোচিত বলে আখ্যা দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। শতশত মানুষের সামনে এ ঘটনা ঘটলেও কেবল এসময় স্বামীকে বাঁচাতে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিই দুই যুবককে বারবার প্রতিহতের চেষ্টা করেন। বাকিরা নীরব দর্শক। তার পাশেই দাঁড়িয়ে অন্যরা এ দৃশ্য দেখলেও কেউ এগিয়ে আসেননি। বরং এ নিষ্ঠুর ঘটনার ভিটিও চিত্র ধারণে মত্য ছিলেন অনেকে। চোখের সামনে ঘটছে এ ঘটনা কিন্তু একজন মানুষকেও পাওয়া যায়নি যিনি ঘটনার প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করে ঠেকাতে গেছেন। চোখের সামনে অন্যায় দেখেও নীরব থাকার এমন প্রবণতা একটা জাতি ধ্বংস হওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাদের বিবেক বলে কি কিছু নেই? বরগুনায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের ‘নীরব দর্শক হয়ে ওঠারও একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। এই ব্যাকগ্রাউন্ড সৃষ্টির দায় কিন্তু আপনি-আমি এড়াতে পারি না।

পুর্বের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, ছবিতে দৃশ্যমান দোষী ব্যক্তিরাও আগামীতে হয়তো আইনের ফাঁক গলে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেখসুর খালাস পাবেন! আমরা এখন ইমোশনাল হয়ে আহ্ উহ্ করছি ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছি। আমরা কিন্তু ভেলারাম বাঙালি। দুদিন পর সব ভুলে যাবো। এটাই বাস্তবতা।

আমরা মনে করি, বর্বরতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে। যখনই আইনের শাসন একটু ঢিলে-ঢালা হবে তখনই সমাজে বর্বরতা বাড়বে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে বর্বরতা বাড়ছে। এ জন্য সামাজিকভাবে পরিবারকে ছোট থেকে শিশুদের নীতি নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। যারা অপরাধী তাদের কঠোরভাবে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তা নাহলে অপরাধীরা বেপরোয়া ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে, সামাজিক অবক্ষয়ের ভয়াবহতা বাড়বে।

আমরা মনে করি দেশের যে কোনো হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত নিশ্চিত করতে ও তার শাস্তি প্রদানে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে সরকারকেই।

লেখক : সাংবাদিক।