ঢল নামছে বাড়ির পথে

দুয়ারে কড়া নাড়ছে ঈদ। আর মাত্র তিন বা চার দিন। তারপরই আকাশে ফোকলা হাসি দিয়ে উঁকি দেবে ঈদের চাঁদ। আর এই ঈদকে কেন্দ্র করেই রাজধানী ঢাকা ছাড়েন অগণিত মানুষ। উপলক্ষ গ্রামে পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ কাটানো। আর ঈদের আগে বাড়ি ফেরার ঢল নামে মানুষের। গতকাল ঈদযাত্রার তৃতীয় দিনে ঢাকা ছেড়েছে বিপুল মানুষ। বাসে-লঞ্চে আর ট্রেনে করে স্ব-স্ব গন্তব্যে যেতে তারা ঢাকা ছাড়েন। ট্রেনে শিডিউল বিপর্যয়ে খানিকটা ভোগান্তি আর লঞ্চে টিকিট পেতে বিড়ম্বনা ছাড়া ঈদযাত্রা স্বস্তিরই ছিল। তবে বাসযাত্রায় তেমন কোনো অভিযোগই আসেনি এবার।

আজ শবেকদরের ছুটি। আগামীকাল ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস। তবে বাড়ির যাত্রা শুরু হয় গেল সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবারে। ইতিমধ্যে অনেকেই ঈদের ছুটি পেয়ে বাড়ি পৌঁছে গেছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় দিনের মতো আজও ঈদযাত্রায় স্বস্তি মিলছে ঘরেফেরা মানুষের। আর যারা এখনো বাড়ি ফেরার ছুটি পাননি তারা অপেক্ষায় আছেন ‘ছুটি’নামক সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়।

গতকাল সরেজমিনে রাজধানীর সায়দাবাদ, গাবতলী, মহাখালী, মিরপুর, ধানমন্ডি, মগবাজারসহ বিভিন্ন টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেহেরির পর থেকেই লোকজন ব্যাগ আর মালামাল নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন, মুখে তাদের আনন্দের হাসি। টার্মিনালগুলোতে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা বিগত বছরগুলোতে বাড়ি ফেরায় অতিরিক্ত ঝক্কি পোহালেও এবার সেই অর্থে সেটা পাচ্ছে না।

টার্মিনালগুলোতে কথা বলে জানা যায়, কাউন্টারগুলো থেকে সময়মতো ছাড়ছে বাস, তাৎক্ষণিক টিকিটও মিলছে। সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রীরা। ঈদ সামনে রেখে দ্বিতীয় মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী সেতু খুলে দেওয়ায় এতদিনের যানজটের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেয়েছেন তারা।

গাবতলী টার্মিনালে কথা হয় সরকারি চাকুরে মিনহাজুল আবেদিন নামের এক যাত্রীর সঙ্গে। মিনহাজুল জানান, তিনি তার গ্রামের বাড়ি খুলনা যাচ্ছেন সপরিবারে ঈদ করার জন্য। তিনি বলেন, ‘বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। আশা করি, কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে। ঈদে বাড়ি যাচ্ছি সবাইকে নিয়ে খুব ভালো লাগছে। যারা আগে বাড়ি গিয়েছে, তাদের কাছে শুনেছি এবার রাস্তা ভালোই ফাঁকা।’

বাসে ঈদযাত্রায় স্বস্তি মিললেও ট্রেনে সেটা মিলছে না। ঈদযাত্রার দ্বিতীয় দিনে প্রথম দিনের মতো ভিড় না থাকলেও কয়েকটি ট্রেন দেরিতে ছাড়ায় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে ঢাকা থেকে বাড়িমুখো মানুষের। ঈদযাত্রার দ্বিতীয় দিন শনিবার ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস, চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতি এক্সপ্রেস ও খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ছেড়েছে দেরিতে।

ট্রেনসূচিতে গড়বড় কাটছে না

ঈদযাত্রার দ্বিতীয় দিনে বাড়িমুখো মানুষের ভিড় কমে এসছে ট্রেনে। তবে কয়েকটি ট্রেন দেরিতে ছাড়ায় বিড়ম্বনা কাটেনি। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে ঢাকা থেকে বাড়িমুখো মানুষের। গতকাল ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস, চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতি এক্সপ্রেস ও খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ছেড়েছে দেরিতে।

নীলসাগর এক্সপ্রেসের যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। ট্রেনটি সকাল ৮টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সাড়ে তিন ঘণ্টা দেরিতে ছেড়ে যায় সাড়ে ১১টার দিকে। রংপুর এক্সপ্রেস সোয়া এক ঘণ্টা দেরি করে কমলাপুর ছেড়ে যায় সোয়া ১০টার দিকে। রংপুর এক্সপ্রেসের নিয়মিত যে ট্রেন সেটি নির্ধারিত সময়ের পরও কমলাপুর এসে না পৌঁছানোয় এ ট্রেনের যাত্রীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় আরেকটি ট্রেন যুক্ত করা হয়।

ফলে ট্রেনের আসন বিন্যাসেও আনা হয় পরিবর্তন। আর এতে চরম বিড়ম্বনা এবং দুর্ভোগের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন যাত্রীরা।

কমলাপুর স্টেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আমিনুল হক বলেন, ‘সকাল থেকে সারা দিনে ৫২টি ট্রেন আমরা চালাব। এর মধ্যে আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেন মিলে (সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ) ১৭টি ট্রেন ছেড়ে গেছে। রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটা ছাড়তে গতকাল সাত ঘণ্টা লেট হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রী মহোদয়ের আশ্বাসে ভিত্তিতে আজকে আমরা বিকল্প রেক দিয়ে চালাচ্ছি। কিছুক্ষণ আগে (সোয়া ১০টায়) ছেড়ে গেল।’

আসনবিন্যাসে অব্যবস্থাপনার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এই ট্রেনটিতে আমরা সাধ্যমতো আসন রিপ্লেস করেছি। দুটি এসি চেয়ারকোচ কম থাকাতে ফার্স্ট ক্লাস চেয়ারে বা ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে সিট দিয়েছি। সবগুলো সিটই আমরা বরাদ্দ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিট সঙ্কুলান করতে না পারায় কিছু সিট সাধারণ শ্রেণিতে দিতে হয়েছে।’

এদিকে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস সকাল ৭টা ১৯ মিনিটে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এক ঘণ্টা দেরি করে কমলাপুর থেকে ট্রেনটি ছেড়ে যায় ৮টা ২০ মিনিটে। চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতি এক্সপ্রেস ট্রেনটিও আধাঘণ্টা দেরি করে কমলাপুর ছাড়ে। সকাল সোয়া ৭টার দিকে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও আধা ঘণ্টা দেরি করে ট্রেনটি পৌনে ৮টায় ছেড়ে যেতে দেখা গেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী রাজশাহী এক্সপ্রেস ট্রেনটির ১২টা ২০ মিনিটে ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু ৩টা ২০ মিনিটের পরে সেটি প্ল্যাটফর্মে আসে। রাজশাহীগামী সিল্ক সিটির যাত্রাও পিছিয়ে ২টা ৪০ মিনিটের টরিবর্তে ৫টা ১০ মিনিটে ছাড়া হয়।

এর বাইরে দেশের অন্যান্য গন্তব্যের ট্রেনের সময়সূচি নিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে তেমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কমলাপুর স্টেশনের ব্যবস্থাপ আমিনুল হক বলেন, ‘৫২টা ট্রেনের মধ্যে চারটা ট্রেন ডিলে হয়েছে। বাকিগুলো ঠিক আছে।’

এবার রোজার ঈদ উপলক্ষে রেলওয়ে প্রথম যে দিনের আগাম টিকিট বিক্রি করেছিল, সেই ট্রেন ছাড়া শুরু হয়েছে শুক্রবার। কিন্তু প্রথম দিনই বেশ কয়েকটি ট্রেন ছাড়তে দেরি হওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে গরমের মধ্যে যাত্রীদের পড়তে হয়েছে অপেক্ষার বিড়ম্বনায়। তবে গতকাল সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কমলাপুর স্টেশনে যাত্রীদের তেমন একটা বাড়তি চাপ দেখা যায়নি।

স্টেশন সংশ্লিষ্টদের অনেকের ভাষ্য, সাধারণ ছুটি বা সাপ্তাহিক ছুটিতে যে চাপ থাকে যাত্রীদের, তার চেয়ে যাত্রীচাপ একটু বেশি। তবে আজ ও আগামীকাল এ চাপ আরেকটু বাড়তে বলে ধারণা করছেন তারা।

এদিকে গত দুই দিন নৌপথে চাপ না থাকলেও গতকাল সদরঘাটে গিয়ে ভালোই ভিড় দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন গন্তব্যমুখী যাত্রী ও নৌবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল থেকেই যাত্রীরা সদরঘাটে আসতে থাকেন। বেলা যত এগোচ্ছিল বাড়ছিল যাত্রীর সংখ্যা। দুপুরের মধ্যে ঘাটে থাকা বেশিরভাগ লঞ্চ যাত্রীতে পূর্ণ হয়ে যায়। বিকালের দিকেও একই চিত্র দেখা যায়, ঢাকা-বরিশালগামী সুরভী-৮ লঞ্চে ডেক প্রায় যাত্রীতে ভরে গেছে।

ঈদযাত্রায় এবার স্বস্তি মিললেও সড়ক, নৌ ও আকাশপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি। ট্রেনের সিডিউল ল-ভ- হওয়ায় রেলপথের যাত্রীসাধারণ অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ সংগঠনটির।

ট্রেন-বাসে এখনো স্বস্তির যাত্রা, চাপ বাড়বে কাল-পরশু

বাস ও ট্রেন কর্তৃপক্ষ জানায়, ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ অন্যবারের চেয়ে এবার কম। লম্বা ছুটি পাওয়ার কারণেই অনেকেই সুবিধামতো সময়ে স্বস্তিতে যাত্রা করছেন। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্টেশন ও ঘাটে যাত্রী বাড়ছে। কাল ও পরশু সবেচেয়ে বেশি যাত্রী চাপ থাকবে বলে মনে করছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহাসড়কগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। চন্দ্রা এলাকায় ঢাকা টাঙ্গাইল মহাড়কে যান চলাচল বেলা বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে। এদিকে গাজীপুরের জয়দেবপুর চৌরাস্তায় রাস্তায় বৃষ্টির পর পানি জমে আছে। যে কারণে এ সড়টিকে যান চলাচলে ধীরগতি রয়েছে। তবে কোনো মহাসড়কের শনিবার বড় ধরনের যানজট বা জটলার খবর নেই বলে জানিয়েছে বিআরটিএর মনিটরিং ইউনিট।

সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে বিআরটিএর বনানী প্রধান কার্যালয় থেকে ২৪ ঘণ্টা বিভিন্ন মহাসড়ক ও টোল আদায়কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিআরটিএর মনিটরিং টিম জানিয়েছে পাটুরিয়া ও মাওয়া ঘাটে যানবাহনের ভিড় নেই। শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি যাত্রীচাপ এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে সাধারণ সময়ের চেয়ে যান চলাচল এখন বেশি।

ঈদযাত্রায় কোনো গাড়ি থামাবে না পুলিশ

ঈদযাত্রায় সড়ক-মহাসড়কে কোনো গাড়ি থামাবে না পুলিশ। কাগজপত্র দেখার প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কোনো গাড়ি থামাতে হলে আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ সুপারের অনুমতি নিতে হবে। ঈদে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতেই হাইওয়ে পুলিশকে লিখিতভাবে এমন একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে হাইওয়ে পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আতিকুল ইসলাম জানান, ঈদযাত্রায় সড়ক পথে গাড়ি থামালে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া ঈদের আগে পুলিশের গাড়ি থামানো নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে তিনি জানান, পুলিশ মহাসড়কে কোনো গাড়ির কাগজপত্র দেখার নামে থামাবে না। তবে নির্দিষ্ট করে কোনো গাড়ির ব্যাপারে অপরাধ সংক্রান্ত কোনো তথ্য আগে থাকলে সেটি ভিন্ন ব্যাপার। সড়কে গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র চেক করার প্রয়োজন পড়লে আগেই ওই এলাকার সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের অনুমতি নিতে হবে। এরপর গাড়ি থামানো যাবে।