রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নতুন আইজিডব্লিউ অপারেটর দিচ্ছে বিটিআরসি

সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে টেলিযোগাযোগ খাতে আন্তর্জাতিক কল পরিচালনায় ইন্টারন্যাশনাল গেইটওয়ে (আইজিডব্লিউ) লাইসেন্স দিতে আগ্রহীদের কাছ থেকে আবেদন চেয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি।

১৯ সেপ্টেম্বর বিটিআরসির ওয়েবসাইটে ঘোষণা দিয়ে আইজিডব্লিউ লাইসেন্স দিতে আগ্রহীদের কাছ থেকে আবেদন চাওয়া হলে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত ১৪টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন।

সংগঠনটির সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, আমাদের দেশে প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারই তাদের নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিয়ে থাকেন।

এতে টেলিকম খাতও ব্যতিক্রম নয়। বিদেশ থেকে কোন কল আসলে প্রথমে যে অপারেটর কল পায় বা বিদেশে কল যাবার জন্য যে অপারেটরের মাধ্যমে কল যায় সেই অপারেটরের নামই হচ্ছে আইজিডব্লিউ (ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে)।

দেশে বর্তমানে আইজিডব্লিউ অপারেটর সংখ্যা ২৩টি। ২০১০ সালে অপারেটর ছিল ৪টি। ২০১২ সালে সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় আরও ২৫টি লাইসেন্স প্রদান করে। এতে মোট অপারেটরের সংখ্যা দাড়ায় ২৯টি।

পরবর্তী বছরে ৬টি অপারেটরের কাছে বিটিআরসির পাওনা দাড়ায় ৬০০ কোটি টাকা। টাকা পরিশোধ না করার দায়ে এই ৬টি অপারেটরের লাইসেন্স বাতিল করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন করে আইজিডব্লিউ-এর জন্য আবেদন আহ্বান করে বিটিআরসি। তার বিপরীতে ১৪টি আবেদন এ পর্যন্ত জমা পড়েছে।

যদি এই ১৪টি আবেদনকে লাইসেন্স প্রদান করা হয় তাহলে দেশে মোট আইজিডব্লিউ অপারেটরের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৭টিতে।

শনিবার বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে লিখেছে, আমাদের প্রশ্ন এতো বিপুল সংখ্যক অপারেটর থেকে গ্রাহকদের লাভ কি? নাকি অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসাকে বৈধতা দেওয়ার জন্যই এই ব্যবস্থা?

এই অপারেটরদের মাঝে সেবা প্রদানের নিশ্চয়তা, জবাবদিহিতা কোনটিই নেই। অর্থাৎ মুনাফাই বেশি। মোবাইল অপারেটরদের মোট বিনিয়োগের ৫ শতাংশও এদের বিনিয়োগ করতে হয় না। অথচ লাভের পরিমাণ প্রায় সমান।

এসকল অপারেটদের আবার জোট থাকায় এদের কোন প্রতিযোগিতায় যেতে হয় না। এই জোটের নাম আইওএফ (আইজিডব্লিউ অপারেটর ফোরাম)। তবে এদের মধ্যেও ক্ষমতার ভারসাম্য করে দেওয়া হয়েছে।

বেশি লাভ করে ৭টি অপারেটর। এদের শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে টিআর-১ ও টিআর-২ নামে। টিআর-১ অপারেটররা ১ টাকা আয় করলে টিআর-২ অপারেটররা লাভ করে ১ টাকা ৯০ পয়সা।

এসব ভাগাভাগি যে রাজনৈতিক কারণে হয়েছে তা এক কথায় পরিস্কার বলে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন। যে রাজনীতি হবার কথা জনগণের কল্যাণে তা আজ মুনাফা করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

সংগঠনটির সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, এটি জনগণের সঙ্গে এক প্রকার প্রতারণা ছাড়া কিছুই না। বিপুল সংখ্যক আইজিডব্লিউ অপারেটরের তখনই প্রয়োজন ছিল যদি তাদের প্রতিযোগিতার কারণে গ্রাহকরা সুবিধা পেত।

তা না করে জনগণের পকেট কাঁটার সকল বন্দোবস্তই করে রাখা হয়েছে। এ অপারেটর ছাড়াও মধ্যস্বত্বভোগী আরেকটি অপারেটর আছে যাকে আইসিএক্স বা ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ বলা হয়ে থাকে।

এ অপারেটর বসে বসে প্রতি কলে ৪ পয়সা ভাগ পায়। এই দু’টি অপারেটরের দৌরাত্মের কারণেও মোবাইল ফোনের কলরেট কমানো যাচ্ছে না বলে মোবাইল ফোন অপারেটররা ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছে।

মহিউদ্দিন বলেন, আমরা মনে করি এ দুটি অপারেটরকেও জবাবদিহিতার আওতায় এনে প্রতিযোগিতার বাজারে ছেড়ে দেওয়া হোক। আইজিডব্লিউ অপারেটরদের জোট ভেঙ্গে দিয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে কলরেট কমানো হোক।

প্রসঙ্গত, গত ১৯ সেপ্টেম্বর নিজেদের ওয়েবসাইটে ঘোষণা দিয়ে আইজিডব্লিউ লাইসেন্স দিতে আগ্রহীদের কাছ থেকে আবেদন চেয়েছিল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি)। একই সঙ্গে ১০ অক্টোবর বুধবার পর্যন্ত আবেদন করার শেষ সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল।

জানা যায়, ১০ অক্টোবর পর্যন্ত বিটিআরসিতে লাইসেন্সের জন্য ১৪টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করলেও মোট কয়টি লাইসেন্স দেওয়া হবে সে বিষয়ে কিছুই নিশ্চিত করেনি বিটিআরসি।

আবেদনকারী কোম্পানিগুলো হলো সোলজার্স গিয়ারস, রেড বিচ রিসোর্স লিমিটেড, এভিস টেকনোলজিস লিমিটেড, রুটস টেক কমিউনিকেশন, ইনফিনিটি টেলিকম লিমিটেড, জয়েন আস নেটওয়ার্ক, আই বিজনেস হোল্ডিংস লিমিটেড, পদ্মা কমিউনিকেশন লিমিটেড, আমান টেল, রা ইনফোটেক, লেভেল থ্রি টেলিকম লিমিটেড, ওয়েল ইনফরমেশন টেক, টুজি টেলিকম এবং রানা ট্রেডিং লিমিটেড।

এর আগে ২০১২ সালে ২৬টি নতুন প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয় বিটিআরসি। নতুন-পুরাতন মিলিয়ে তখন মোট আইজিডব্লিউ লাইসেন্সের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯টিতে।

১৫ কোটি টাকা দিয়ে তখন লাইসেন্স নিয়েছিল প্রতিষ্ঠানগুলো। ২৯টি আইজিডব্লিউ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বর্তমানে ২৩টি কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করছে।

নতুন আইজিডব্লিউ লাইসেন্স নেওয়ার পর ব্যবসা পরিচালনা করতে না পেরে নবায়ন ও অন্যান্য ফি দিতে না পারায় ইতোমধ্যে ৬টির লাইসেন্স স্থগিত করে বিটিআরসি।

সব অপারেটর মিলে দিনে ১১ কোটি মিনিটের বেশি কল দেশে আনত। তাদের স্বেচ্ছাচারী আচরণের কারণে কল কমতে কমতে এখন সেটি দিনে চার কোটি মিনিটে নেমে এসেছে।

বিটিআরসির নিয়মানুযায়ী প্রতি মিনিট কল থেকে যে আয় হয় বিটিআরসি তার ৪০ শতাংশ, ইন্টার কানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ, মোবাইল অপারেটর ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ও আইজিডব্লিউ অপারেটরগুলো বাকি ২০ শতাংশ পাচ্ছে।

দেশে ২১ আইজিডব্লিউ অপারেটরের মধ্যে সাতটি আইজিডব্লিউ অপারেটর সিন্ডিকেট করে কলরেট বাড়ানোর ফলে আগের নিয়মেই অর্থের অংশ পাচ্ছে সরকার। নতুন নিয়মে মাত্র সাতটি অপারেটর কল টার্মিনেট বা গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

আইজিডব্লিউ (ইন্টারনেট গেটওয়ে) কোম্পানিগুলো বাড়তি টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছে। ফলে বৈধভাবে আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদান কমে গেছে। আগে বৈধভাবে প্রতিদিন সাড়ে ১১ থেকে ১২ কোটি মিনিট আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদান হতো।

এখন বৈধভাবে কল আদান-প্রদান হচ্ছে সাড়ে ৬ থেকে ৭ কোটি মিনিট। অবৈধ পথে টাকা চলে যাচ্ছে আইজিডব্লিউ অপারেটরদের পকেটে। আন্তর্জাতিক কল কমে যাওয়ার জন্য দুটি বিষয়কে দায়ী করছে বিটিআরসি। কল সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য দায়ী আন্তর্জাতিক গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) অপারেটররা।

তারা কল রেট দেড় থেকে দুই সেন্ট করে বৈধ পথে কলসংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। সরকারের ঠিক করে দেওয়া প্রতি মিনিটের জন্য দেড় সেন্ট রেট মানতে নারাজ ছিল অপারেটররা।

পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই জোটবদ্ধ হয়ে দুই সেন্টের নিচে কোনো কল দেশে ঢুকতে দেয়নি। যার ফলে দ্রুত বেড়েছে অবৈধ কলের পরিমাণ।