পূর্ব ঢাকাকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের | |

পূর্ব ঢাকাকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের

বিশ্বব্যাংকের ‘টুওয়ার্ড গ্রেট ঢাকা: এ নিউ আরবান ডেভেলপমেন্ট প্যারাডাইম ইস্টওয়ার্ড’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। গ্লোবাল সিটির অংশ হিসেবে ঢাকাকে কিভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘পাওয়ার হাউস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, সেই গবেষণা করেছে বিশ্বব্যাংক; যা এই প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য বলে জানায় সংস্থাটি।

বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যম আয়ের লক্ষ্য অর্জনে ঢাকার আধুনিকায়নের তাগিদ দিয়ে বিশ্বব্যাংক বলছে, যানজটের কারণে ঢাকায় দিনে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। বিগত ১০ বছরে যান চলাচলের গড় গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে কমে ৭ কিলোমিটারে পর্যন্ত নেমে এসেছে। অথচ পায়ে হেঁটে চলার গড় গতি হচ্ছে ঘন্টায় ৫ কিলোমিটার।

সংস্থাটির প্রতিবেদন বলা হয়েছে, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পূর্ব ঢাকাকে আধূনিক ও উন্নত নগর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এটি করা গেলে, সেখানে অতিরিক্ত ৫০ লাখ লোকের বসবাস ও ১৮ লাখ লোকের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

তবে এজন্য ৩টি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেগুলো হলো- বন্যার হাত থেকে ওই এলাকাকে রক্ষা করতে ও পানির গতি ঘোরাতে বালু নদীর তীরে একটি বাঁধ দিতে হবে, ক্রমবর্ধমান সাধারণ ট্রান্সপোর্ট ও পাবলিক ট্রান্সপোর্টের চলাচলের উন্নয়নে সমন্বয় সাধন করতে হবে। এর বাইরে ঢাকার পূর্বে আন্তর্জাতিক মানের একটি ‘বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট’ বা ব্যবসায়ীক এলাকা গড়ে তুলতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ৩ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে ব্যয় হতে পারে ১ হাজার ৫শ কোটি ডলার। ওই অঞ্চলে এই অর্থ ব্যয় করা হলেও ২০৩৫ সালের মধ্য সেখানে বছরে ৫ হাজার ৩শ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম হবে।

আর এই অর্থনৈতিক কার্যক্রম রাজধানীবাসীর আয় বাড়িয়ে দেবে। এখন যেখানে রাজধানীবাসীদের মাথাপিছু আয় ৮ হাজার ডলার সেটা ২০৩৫ সাল নাগাদ পৌঁছবে ৯ হাজার ২০০ ডলারে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, ঢাকা মহানগরীর দ্রুত সম্প্রসারণের সাথে ঢাকার নগর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সামঞ্জস্য রাখা হয়নি। ফলে একটি বিশৃঙ্খল প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। প্রায় ৩৫ লাখ বস্তিবাসীসহ অনেক অধিবাসী মৌলিক সেবা, অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে অক্সফোর্ডের প্রফেসর এনথনি ভেনাবল বলেন, গড় হারে প্রতিদিন ঢাকায় মানুষ বাড়ছে। বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা হবে সাড়ে ৩ কোটি। ঢাকা এখন প্রচুর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। সেটা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় বিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্টিন রামা বলেন, অধিক লোকসংখ্যা ও যানজটের কারণে বর্তমানে চরম দূর্ভোগে রয়েছেন ঢাকাবাসী। কিন্তু পূর্ব ঢাকায় নগরায়ন করা হলে সেখানে সুপরিবেশে একটি মানসম্মত এলাকা তৈরি করা যাবে। তবে এজন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান বলেন, পূর্ব ঢাকাকে নতুন সিটি হিসেবে তৈরি করতে হলে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন জরুরি। এটি বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা বিশ্ব ব্যাংক পাশে থাকবে বলে জানান তিনি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, এটা একটা ভাল রিপোর্ট। কিভাবে ঢাকাকে আরও বসবাস উপযোগী করা যায় এখানে সেটা দেখানো হয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে ১ হাজার ৫শ থেকে ২ হা্জার কোটি টাকা লাগতে পারে। তবে অর্থায়নে সমস্যা হবে না। সমস্যা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা। কারণ এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা লাগে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। ফলে সুপরিকল্পনা নেয়া হলেও থেমে যায় অনেক উদ্যোগ। তাই বেশি প্রতিষ্ঠানের উপর দায়িত্ব না দিয়ে সক্ষম কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়া হলে পূর্ব ঢাকাকে আধুনিক ঢাকায় রূপান্তর করা যাবে বলে জানান তিনি।

স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ভিত্তি স্থপতি বৃন্দ লিমিটেডের পরিচালক ইকবাল হাবিব বলেন, সঠিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভূমি নিয়ন্ত্রণ- এসব ক্ষেত্রে রাজউক ব্যর্থ হচ্ছে। তাই সঠিক নগরায়ন গড়ে উঠছে না।

তিনি বলেন, ঢাকার উন্নয়নে দেশের ১১টি মন্ত্রণালয়ের প্রায় ৫৪টি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এত প্রতিষ্ঠান না করে যদি ২/১টি প্রতিষ্ঠান কাজ করে তাহলে কাজে গুতি আসবে। সফলভাবে কাজ সম্পন্ন করা যাবে।

তবে পূর্ব ঢাকাকে নগরায়ন করতে ২ হাজার ৭শ কোটি ডলার দরকার বলে জানান স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ঢাকার উন্নয়নের সাথে সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন সমস্যা রয়েছে। তবে ভিশন ২১ বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে।