আনিসুল হকের ১০ বড় উদ্যোগ থমকে আছে | |

আনিসুল হকের ১০ বড় উদ্যোগ থমকে আছে

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের নেওয়া অন্তত ১০টি বড় উদ্যোগ ও প্রকল্পের অগ্রগতি থমকে গেছে। নগরবিদ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁর কাজগুলো চালিয়ে নেওয়ার মতো নেতৃত্ব না থাকাই এর মূল কারণ।

২০১৫ সালে ডিএনসিসির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ঢাকা উত্তরের জন্য সাহসী কিছু পদক্ষেপ নেন আনিসুল হক। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ, গাবতলীসহ ৯টি জায়গাকে পার্কিংমুক্ত করা। বনানীতে মোনায়েম খানের বাড়ির ভেতরে থাকা ডিএনসিসির জায়গা উদ্ধার।

বিমানবন্দর সড়কের যানজট কমাতে ১১টি ইউটার্ন নির্মাণ, ঢাকাকে সবুজ করতে ৫ লাখ গাছ লাগানো, রাস্তায় এলইডি বাতি লাগানো, নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পার্ক ও খেলার মাঠ উন্নয়ন, ১০০ আধুনিক গণশৌচাগার নির্মাণ, গণপরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে এক বা একাধিক কোম্পানির অধীন চার হাজার বাস নামানো এবং গাবতলীতে উদ্ধার করা ৫২ একর জায়গা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ একাধিক প্রকল্পের জন্য ব্যবহার করা।

আনিসুল হকের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা না হলে নগরবাসী বঞ্চিত হবেন বলে মনে করেন নগর গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঢাকায় আনিসুল হকের মতো শক্তিশালী নেতৃত্ব দরকার। এখন যাঁরা দায়িত্বে আছেন, তাঁরা চেষ্টা করলে উদ্যোগগুলো বাস্তবে রূপ দিতে পারেন।

ডিএনসিসির প্যানেল মেয়র ওসমান গণি বলেন, কাজ করতে গিয়ে কিছু জটিলতা হচ্ছে, এটা সত্য। তাই বলে প্রয়াত মেয়রের শুরু করা কাজগুলো থেমে নেই।

রাস্তা থেকে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড সরানো: তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের সামনের সড়কটি দখলমুক্ত করে সাড়া জাগিয়েছিলেন আনিসুল হক। ইদানীং সড়কের ভূমি ও জরিপ অধিদপ্তরের সামনের সড়কজুড়ে আবার ট্রাক রাখা হচ্ছে। সাতরাস্তা মোড়ে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানির উল্টো দিকে, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের সামনে এবং রেলক্রসিংয়ের আগে সড়কের পাশে এক সারি করে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে।

সাতরাস্তা দখলমুক্ত রাখতে প্যানেল মেয়র ওসমান গণি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, সিটি করপোরেশনের অনুরোধের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ট্রাকস্ট্যান্ডটিই এখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।

ডিএনসিসির আরও আটটি এলাকা পার্কিংমুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে গাবতলী, কল্যাণপুর, আমিনবাজার, মহাখালী, মোহাম্মদপুর, আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড অন্যতম। এসব জায়গায়ও অবৈধ পার্কিং ফিরে আসছে।

মোনায়েম খানের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা জায়গা: স্বাধীনতাবিরোধী মোনায়েম খানের পরিবারের অবৈধ দখল থেকে ১৪ কাঠা জমি উদ্ধার করেছিল ডিএনসিসি। পাশের কবরস্থানের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ওই জায়গায় এটা পার্কের নকশা করা হয়েছিল। এখন এ নিয়ে আলাদা কোনো প্রকল্প আর ডিএনসিসিতে নেই।

ইউটার্ন প্রকল্প: সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন (লেন পরিবর্তন করতে ভূমিতেই গাড়ি ঘোরানোর জায়গা) নির্মাণের কাজ গত বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উত্তরার র‍্যাব-১-এর কার্যালয় ও রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স বাদে বাকি ৯টি জায়গায় নির্মাণকাজ বন্ধ আছে। ডিএনসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম বলেন, সড়ক ও জনপথসহ সরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে জমি পাওয়ার আশ্বাস পেয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু জমি পাওয়া যাচ্ছে না।

সবুজ ঢাকা: তিন বছরে ৫ লাখ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়ে ২০১৬ সালের মে মাসে ‘সবুজ ঢাকা’ প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়।

ডিএনসিসির পরিবেশ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তারিক বিন ইউসুফ বলেন, প্রকল্পটিতে সিটি করপোরেশনের কোনো টাকা বরাদ্দ ছিল না। মেয়র ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করছিলেন। এখন এই প্রকল্পের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই।

এলইডি বাতি ও সিসি ক্যামেরা: রাস্তায় প্রয়োজনীয় আলো ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে এলইডি বাতি ও সিসি ক্যামেরা বসানোর প্রকল্প নিয়েছিলেন প্রয়াত মেয়র। ৪৪২ কোটির প্রকল্পটি অনুমোদনও পায় একনেকে।

মেয়র মারা যাওয়ার পর এই প্রকল্প বিভক্ত হয়ে গেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সাত হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের আওতায় নগরে সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে ডিএনসিসি এখন শুধু এলইডি বাতির কাজ করবে।

প্যানেল মেয়র ওসমান গণি বললেন, আনিসুল হক চেয়েছিলেন উন্নত মানের বাতি লাগাতে। তাই ডিএনসিসি জার্মানির একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বাতি কিনবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে অধিকাংশ এলাকায় এলইডি বাতি লাগানো হবে।

পার্ক ও খেলার মাঠ: দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে আনিসুল হক জানিয়েছিলেন, তাঁর পরবর্তী কাজ পার্ক ও খেলার মাঠগুলোর উন্নয়ন করা।

ডিএনসিসি সূত্র জানায়, উন্মুক্ত স্থানসমূহের আধুনিকায়ন, উন্নয়ন ও সবুজায়নের জন্য প্রায় ২৮০ কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে একনেক। এর আওতায় ২২টি পার্ক ও ৪টি খেলার মাঠ এবং ডিএনসিসি এলাকার গণশৌচাগার, স্বাস্থ্যসম্মত জবাইখানা ও কবরস্থানের উন্নয়ন হবে। চারটি পার্কের উন্নয়নকাজের দরপত্র করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকিগুলো করা হবে।

১০০ গণশৌচাগার: রাজধানীতে গণশৌচাগারের তীব্র সংকট থেকে উত্তরণে মেয়র ১০০টি আধুনিক গণশৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ওয়াটারএইডের সহায়তায় ১৫টি চালু হয়েছে।

ডিএনসিসি এখন বলছে, গণশৌচাগার নির্মাণের মতো জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।

চার হাজার বাস: গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে চার হাজার বাস নামানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন আনিসুল হক। কিন্তু এই কাজ আটকে গেছে। সিটি করপোরেশনও হাত গুটিয়ে নিয়েছে। দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বললেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা সিটি করপোরেশনের নেই।

গাবতলীর জায়গা: গাবতলীতে অবৈধ দখলে থাকা ৫২ একর জমি গত বছর উদ্ধার করে ডিএনসিসি। এখানে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্ল্যান্ট, মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ, বাস, ট্রাক ডিপোসহ কিছু স্থাপনা করার পরিকল্পনা ছিল। প্যানেল জানিয়েছেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্ল্যান্ট করার পরিকল্পনা হচ্ছে। কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সূত্রঃ প্রথম আলো