গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান | |

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান

প্রতিচ্ছবি রিপোর্টঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও চেতনাকে ধারণের মধ্যদিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার দেয়া পৃথক বাণীতে এ আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনাকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক-এটাই হোক বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে সকলের অঙ্গীকার।

তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। বাঙালি জাতির অবিস্মরণীয় এ দিনে আমি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহার কারণে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলার মুক্তিকামী মানুষ অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে।

আবদুল হামিদ বলেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। মহাকালের মহাকবির এই ভাষণকে ঘিরেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, জন্মলাভ করে সার্বভৌম রাষ্ট্র। ঐতিহাসিক এ ভাষণকে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামান্য দলিল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মেমোরি অভ্ দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করেছে,যা বাঙালি জাতির জন্য এক গৌরবময় অর্জন।

তিনি বলেন, মুক্তিসংগ্রামের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং সর্বস্তরের জনগণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওই দিনই পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ৩২ নম্বরের বাসা থেকে গ্রেফতার করে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে আটকে রাখে। মিয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দিকালীন তাঁর ফাঁসির হুকুম হয়েছিল।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলবো, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা’। দেশ ও জনগণের প্রতি এমন অকৃত্রিম ভালোবাসার উদাহরণ বিশ্বে বিরল। সেখানে বঙ্গবন্ধু ৯ মাস ১৪ দিন কারাভোগ করেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁর নামেই মুক্তিযুদ্ধ চলতে থাকে। তিনিই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রেরণার উৎস। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের পেছনে রয়েছে জাতির পিতার অপরিসীম অবদান। বাঙালির অধিকার আদায়ে তাঁকে বারবার কারাবরণ করতে হয়।

আবদুল হামিদ বলেন, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বিজয়ীর বেশে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার মাধ্যমে বাঙালির স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়। সেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে লাখো জনতার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন, “আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার সোনার বাংলা আজ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র”।

তিনি আরো বলেন, ‘এখন যদি কেউ বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণ করতে চায় তাহলে সে স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য মুজিব সর্বপ্রথম তাঁর প্রাণ দেবে’। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিজের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর কথা রেখে গেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে তাঁর আদর্শ মুছে দিতে এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব খর্ব করতে অপচেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু বাঙালি বীরের জাতি। যতদিন বাংলাদেশ ও বাঙালি থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু সবার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।

বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তিও চেয়েছিলেন উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সে লক্ষ্যে সদ্যস্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের কাজও শুরু করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে অগ্রগতির সে যাত্রাকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দেশকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিতে নিরলস প্রয়াস চালাচ্ছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নিম্ন মধ্যআয়ের দেশে পরিণত হয়েছে এবং শিগগির মধ্যআয়ের দেশে পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্নখাতে বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে।

অন্যদিকে পৃথক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, উন্নত, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, আসুন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, উন্নত, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করি। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের আগেই উন্নত, সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করবো।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আজ দেয়া এক বাণীতে এ আহ্বান জানান। আগামীকাল ১০ জনুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি এক ঐতিহাসিক দিন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এদিন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।

তিনি বলেন, জাতির পিতার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জনগণের এ রায়কে উপেক্ষা করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে প্রহসনের আশ্রয় নেয়। বাঙালির ওপর নেমে আসে ইতিহাসের নির্মম গণহত্যা।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। জাতির পিতা ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করার পরপরই পাকিস্তানিবাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের নির্জন কারাগারে প্রেরণ করে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস নিভৃত কারাগারে তিনি অসহনীয় নির্যাতনের শিকার হন। প্রহসনের বিচারে ফাঁসির আসামী হিসেবে তিনি মৃত্যুর প্রহর গুণতে থাকেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি বাঙালির জয়গান গেয়েছেন।

জাতির পিতা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণশক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর অবিসংবাদিত নেতৃত্বে বাঙালি জাতি মরণপণ যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে আনে। পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাধ্য হয় বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে। জাতির পিতা ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি বাংলার মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। ওইদিন তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমুদ্রে এক ভাষণে তিনি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দেন। বাঙালি জাতি ফিরে পায় জাতির পিতাকে। বাঙালির বিজয় পূর্ণতা লাভ করে।

শেখ হাসিনা বলেন, স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর জাতির পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যদের দ্রুত দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বন্ধু-দেশসমূহ দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে ওআইসি’র সদস্য হয়। বঙ্গবন্ধুর ঐন্দ্রজালিক নেতৃত্বে অতি অল্পদিনের মধ্যেই বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান তৈরি হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী চক্র বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখলকারীরা গণতন্ত্র হত্যা করে। সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে। রুদ্ধ করে দেয় প্রগতি ও উন্নয়নের ধারা।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম আর ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে আমরা দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছি। আওয়ামী লীগ সরকারের নিরলস প্রচেষ্টায় দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ৫ কোটি মানুষ মধ্যম আয়ের স্তরে উঠে এসেছে। সাক্ষরতার হার ৭২ শতাংশর বেশি হয়েছে। ৮৩ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের সুযোগ বন্ধ করে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আজ সমগ্র দেশ ও জাতি গর্বিত। সারাবিশ্ব আমাদের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করছে। এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে সংবিধান ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার মাধ্যমে।
সূত্র-বাসস