খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক শেষ হলেও আদালতে উপস্থিত থাকতে হবে | |

খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক শেষ হলেও আদালতে উপস্থিত থাকতে হবে

প্রতিচ্ছবি রিপোর্টঃ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। খালেদার পক্ষে যুক্তিতর্ক শেষে এ মামলার অপর আসামিদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন তাদের আইনজীবীরা। তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য বুধ ও বৃহস্পতিবারও সময় আছে।

মঙ্গলবার দুপুরে খালেদা জিয়ার পক্ষে তার আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ এই যুক্তিতর্ক শেষ করেন। বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের মাঠে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামানের এই আদালতে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলারও বিচার চলছে। আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলেই দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নয় বছর আগে দুদকের দায়ের করা এ মামলা রায়ের পর্যায়ে আসবে।

এদিকে নিজের যুক্তিতর্ক শেষ হলেও এখন থেকে মামলার প্রতিটি নির্ধারিত তারিখে এবং অন্য আসামিদের যুক্তিতর্ক চলাকালে রাজধানীর বকশী বাজার আলিয়া মাদ্রাসায় স্থাপিত বিশেষ আদালতে উপস্থিত থাকতে হবে খালেদা জিয়াকেও।

মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার পক্ষে দুটি আবেদন দাখিল করা হয়। একটি হলো তাকে স্থায়ী জামিন দেওয়ার জন্য এবং অন্যটি হলো, তার পক্ষে যুক্তিতর্ক শেষ হয়ে যাওয়ায় অন্য আসামিদের যুক্তিতর্ক চলাকালে আগামী তিন কার্যদিবস যেন খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির না হতে হয়।

তবে দুটি আবেদনই নামঞ্জুর করেন বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামান। ফলে অন্য আসামিদের যুক্তিতর্কের সময়ও খালেদা জিয়াকে আদালতে উপস্থিত থাকতে হবে। এ ছাড়া স্থায়ী জামিন না হওয়ার কারণে মামলার প্রতিটি তারিখেই আদালতে হাজির হতে হবে বিএনপির প্রধানকে।

এর আগে আজ বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে খালেদা জিয়ার আইনজীবী মওদুদ আহমেদ বক্তব্য শুরু করেন। তিনি আদালতে তিনটি বিষয় উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমত, এই মামলা দুটি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। এ মামলা খারিজ করা উচিত ছিল।’

‘দ্বিতীয়ত, মামলা দাখিলের আগে সাধারণত কোনো ব্যক্তির অভিযোগ থাকে। কিন্তু এই মামলায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। তৃতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে রাষ্ট্রপতির প্যাডে এই মামলাটি তৈরি করে। অথচ রাষ্ট্রপতির প্যাডের মামলার অনুমোদনের বিষয়টি ১৯৯১ সালেই বাতিল হয়ে গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের বিধিমালা মোতাবেক এই মামলা দায়ের করা হয়নি।’ উল্লেখ করে এ বিষয়ে মওদুদ আহমেদ বিভিন্ন আইনের যুক্তি তুলে ধরেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ তার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নজির হিসেবে উপস্থাপন করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সংশ্লিষ্ট ছিলেন- ১৯৬৪ সালের এমন একটি মামলার উদাহরণ টেনে বিএনপি নেতা মওদুদ বলেন, ‘সেই সিদ্ধান্তটি ছিল- বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। ওই মামলার ঘটনার মত এই মামলার কারণেও খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা বাড়বে এবং তিনিই হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।’

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আদালতে দাবি করেন, ‘এই মামলার ঘটনার সঙ্গে আমাদের যদি কোনো অনিয়মও থাকে, তাহলেও এ মামলা হয় না, কারণ আমাদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না।’

এ মামলাকে ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন ‘অবৈধ সরকারের’ আমলের মামলা আখ্যায়িত করে খালেদার আইনজীবী বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের অপব্যবহার করে এটি দায়ের করে।’

ফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপের বরাতে মওদদু বলেন, ‘আমি তখন জেলে ছিলাম। ক্ষমতা দখল করতে হলে কী করা যায়, সে বিষয়ে তারা কথা বলেছিল। প্রথমে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা তারা নিয়েছিল। পরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ১৩টি এবং আমাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে চারটি মামলা দায়ের করে। এই মামলা তার একটি।’

তিনি বলেন, ‘এই মামলায় প্রাইমারি এভিডেন্সও নাই, সেকেন্ডারি এভিডেন্সও নাই। এটা একটি অবরুদ্ধ আদালত। এক-এগারোর সময়ে এ ধরনের আদালতে বিচার হত। এটা কোনো উন্মুক্ত আদালত না।’

এ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় থেকেও বিভিন্ন অংশ আদালতে পড়ে শোনান বিএনপি নেতা মওদুদ।

এই তিনটি বিষয়ের ওপর বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, ‘এই মামলায় খালেদা জিয়াকে সম্মানের সহিত খালাস দেবেন বলে আমি আশা করি। কারণ এই মামলার আইনি কোনো ভিত্তি নেই।’

এই মামলার কার্যক্রমকে ক্যামেরা ট্রায়ালের সঙ্গে তুলনা করে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, ‘এখানে আইনজীবীদের জন্য কোনো বসার ব্যবস্থা নেই, এখানে নির্যাতনমূলক বিচার হচ্ছে বলে আমি মনে করি। কারণ এখানে অনেক আইনজীবী আসতে পারেন না, সাধারণ মানুষও আসতে পারে না।

এরপরও এখানে খালেদা জিয়ার আরো ১৪টি মামলা স্থানান্তর করা হয়েছে। আমরা হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগে যখন মামলা পরিচালনা করি তখন বিচারক এবং আইনজীবীদের দূরত্ব থাকে আট ফিট। কিন্তু এখানে দূরত্ব ১০০ ফিটেরও বেশি। আপনাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য এতটা দূরত্ব রাখা হয়েছে যা কোনোভাবেই ঠিক নয়। মামলার শুনানিরও ভালো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।’

সবশেষে আদালতকে উদ্দেশ করে খালেদা জিয়ার এই আইনজীবী বলেন,’ এতদ্বারা আপনি এই মর্মে উপসংহারে আসবেন যে সম্মানের সহিত খালেদা জিয়াকে খালাস দেবেন।’

তার বক্তব্যের পর ১০দিন ধরে চলা এই শুনানির জন্য বিচারক, আইনজীবী ও সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান খালেদার আরেক আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া।