এবার রাজশাহীতে আম ফলনের আশা ৬ লাখ মেট্রিক টন | |

এবার রাজশাহীতে আম ফলনের আশা ৬ লাখ মেট্রিক টন

রাজশাহী অঞ্চলে এবার আমের ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই শেষ পর্যন্ত দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া না থাকলে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন আমের ফলনের আশা করা হচ্ছে। কিন্তু খারাপ আবহাওয়া বিরাজ করলে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এরইমধ্যে গাছ থেকে জাতভেদে আম নামানোর জন্য রাজশাহীতে সময়সূচি ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। এখন অপেক্ষায় সবাই।

রাজশাহী অঞ্চলে গত ৩০ এপ্রিল প্রচণ্ড ঝড় ও শিলাবৃষ্টি হয়। এতে করে অনেক আমের গুটি ঝড়ে পড়ে। তবে অস্বাভাবিক রকমের আমের মুকুল এবার গাছে গাছে ছিল। তাই অনেক মুকুল ও গুটি গাছ থেকে ঝরে পড়ায় ঠিকে থাকা আমের পরিপক্কতা ভালো হয়েছে। ফলে গাছ থেকে আম নামানো পর্যন্ত আর কোনও বড় দুর্যোগ না হলে এবার বাম্পার ফলনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের রাজশাহী অঞ্চল অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ২৬ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। আর এই জেলায় অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার মেট্টিক টন। একইভাবে নওগাঁ জেলায় ১২ হাজার ৬৭১ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৬১ হাজার ২৪২ মেট্রিক টন, নাটোরে ৪ হাজার ৮২৩ হেক্টর জমিতে ৫৬ হাজার ২১ মেট্রিক টন ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জেলায় ১৬ হাজার ৯৬১ হেক্টর জমিতে আম বাগান ছিল। এবার তা বেড়ে হয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৩ হেক্টর। আর বাগানে রয়েছে ২৪ লাখ ২৬ হাজার ১৮৯টি আম গাছ। কোনও দুর্যোগ না হলে এবার ২ লাখ ১৭ হাজার ৭৫০ মেট্রিক টন আশ্বিনা, ল্যাংড়া, লক্ষণভোগ, ক্ষিরসাপাত, আম রুপালি, তোতাপরি ও স্থানীয় জাতের গুটি আমের ফলন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। হিসাব মতে, সবচেয়ে বেশি আমের গাছ রয়েছে চারঘাট ও বাঘা উপজেলায়। এরমধ্যে চারঘাট উপজেলায় তিন হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে ৫ লাখ ৫২ হাজার ৪৫০টি এবং বাঘা উপজেলায় ৮ হাজার ৩৬৮ হেক্টর জমিতে ১১ লাখ ৯৬ হাজার ৬২৪টি গাছ আছে।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম এলাকার আম চাষি শফিউর রহমান শফি জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার সবচেয়ে বেশি গাছে মুকুল এসেছিল। মুকুল আসার সময় আবহাওয়ায় কোনও কুয়াশা ছিল না। প্রতিদিনই রোদ উঠেছে। আর এ কারণেই মুকুলে ছত্রাক বা পোকা আক্রমণ করতে পারেনি। ফাল্লুনের মাঝামাঝিতে এক পশলা বৃষ্টি মুকুলের জন্য উপকারী হয়ে দেখা দিয়েছিল।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার আম চাষি সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রত্যেক বছর গাছে মুকুল আসার সময় বৃষ্টি ও কুয়াশায় নষ্ট হয়ে যায়। তবে এবার মুকুল আসার সময় রাজশাহীর আবহাওয়া ভালো ছিল। এরপর মুকুল ফোটার আগে কীটনাশক এবং ছত্রাকনাশক স্প্রে করা হয়। তাই পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকেও ফলন রক্ষা পেয়েছে।

বাগমারা উপজেলার আম চাষি আক্কাস আলী মাস্টার বলেন, ভালো ফলন হলে দাম কমে যায়। তাই সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, চাষিরা যেন সহজেই পর্যাপ্ত আম বিদেশ পাঠাতে পারেন। একইসঙ্গে আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার জন্য বিশেষ করে রাজশাহীতে শিল্প কারখানা গড়ে তোলার দাবি করছি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার লাওঘাটা এলাকার সাকিল আহমেদ জানান, এবার নওগাঁ জেলার পোরশা উপজেলার সোমনগর এলাকায় ৯৫ হাজার টাকায় এক মৌসুমের জন্য ৩৩০টি আম রূপালি ও ল্যাংড়া জাতের গাছ কেনা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে সেখানে ৬৫ মণ আম পাওয়া যাবে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক দেব দুলাল ঢালী বলেন, এবার তেমন ঝড় না হওয়ায় এবং আবহাওয়া ভালো থাকায় প্রচুর আম রয়েছে। তবে ফল পাকার আগে ঝড় হলে চাষিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন। কারণ, তখনকার ছোট ঝড়েও আম পড়বে বেশি।

রাজশাহী ফল গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলিম উদ্দিন বলেন, আশা করছি এবার দেশের মানুষ পর্যাপ্ত আম খেতে পারবেন। তবে এ বছর পর্যাপ্ত গরম না পড়ায় আম পাকার সময় কিছুটা পিছিয়ে যেতে পারে। আম পাকার সময় ফলে মাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। তখন চাষিদের বাগানের যত্ন নিতে হবে।

রফতানির ব্যাপারে রাজশাহীর চাষিদের অভিযোগ, বিদেশে পাঠানোর জন্য তারা ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম উৎপাদন করেও গত বছর বিদেশে পাঠাতে পারেননি। গত বছর প্রায় ৭০ টন আম (দুই লাখ আম) ব্যাগিং করা হলেও বিদেশে গেছে মাত্র ১৫ থেকে ২০ টন।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পাকুরিয়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম সানা বলেন, গতবছর পোকায় আক্রমণ করা কিছু আম ইউরোপে যাওয়ার কারণে হঠাৎ করেই আম নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে প্রায় দুই লাখ ব্যাগিং করা আম বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক দেব দুলাল ঢালী বলেন, গত বছর ৫০ টন আম বিদেশে পাঠানোর টার্গেট ছিল। তবে ১৫-২০ টনের বেশি যায়নি। কারণ বিদেশিদের উপযোগী করে এখনও দেশে আম উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। বিদেশে আম পাঠাতে হলে ২৬টি শর্ত মানতে হয়। ব্যাগিং তার মাত্র একটি শর্ত। তাই খালি ব্যাগিং করলেই চলবে না, মানতে হবে আরো ২৫টি শর্ত। এভাবে শর্ত মেনে আম উৎপাদন বেশ কঠিন। তারপরও শুধু বাঘা উপজেলার ১৪ জন চাষির সঙ্গে রফতানিকারকরা এবার চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। তারা ২৬টি শর্ত মেনেই আম উৎপাদনে রাজি হয়েছেন। এবার ১০০ টন আম বিদেশে পাঠানোর টার্গেট রয়েছে। তবে মনে হয় না ৪০ টনের বেশি যাবে। কারণ এক টন আম বিদেশে পাঠাতে গেলে ১০০ কেজি আম বাছাইয়ের সময় নষ্ট হয়।

উল্লেখ্য,রাজশাহীতে ২০ মে’র আগে গাছ থেকে নামানো যাবে না গোপালভোগ জাতের আম। হিমসাগর,ক্ষিরসাপাত ও লক্ষণভোগ নামানো যাবে না ১ জুনের আগে। আর ল্যাংড়া নামানো যাবে জুনের ৬ তারিখের পর থেকে। এছাড়া আম রূপালি ও ফজলি ১৬ জুন এবং আশ্বিনা জাতের আম ১ জুলাইয়ের আগে চাষিরা গাছ থেকে পাড়তে পারবেন না বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদের বলেন, রাজশাহীর আমে কখনও ফরমালিন মেশানো হয় না। কৃত্রিমভাবেও আম পাকানো হয় না। কিন্তু যখন বাজারে অনেক আগে কিংবা পরে আম পাওয়া যায়, তখন অনেকে মনে করেন যে এতে কেমিক্যাল দেওয়া আছে। ক্রেতাদের এই ভীতি দূর করতেই আম পাড়ার একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে নেওয়া হলো। এতে কেউ মনে করবে না যে, এই আম এখন গাছে থাকার কথা নয়। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সবার আগে চাষিদের স্বার্থ রক্ষা করা হলো।

তিনি জানান, বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী আম নামানো হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করা হবে। এজন্য প্রতিটি উপজেলার নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান ও কৃষি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে মনিটরিং কমিটি গঠন করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ের আগে আম পাড়া হলে এই কমিটি ব্যবস্থা নেবে। আর চাষি ও ব্যবসায়ীদের সব সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করবে। এজন্য রাজশাহী জেলার সবচেয়ে বড় আমের হাট পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজারে অস্থায়ী অফিস খুলবেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। বানেশ্বরে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের শাখাগুলো শনিবারও খোলা থাকবে। এছাড়া জেলা প্রশাসন থেকে তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিনে আট ঘণ্টা করে ২৪ ঘণ্টা সেখানে দায়িত্ব পালন করবেন। আর আম পরিবহনে যেন কোনো সমস্যা না হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করবে পুলিশ।

রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতেখায়ের আলম বলেন, আম চাষি ও ক্রেতারা যাতে হয়রানি না হয়, সেই বিষয়টি প্রত্যেক বছরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখভাল করে থাকে। এবারও তা ব্যতিক্রম হবে না।