বাঙালি উৎসব প্রিয় জাতি | |

বাঙালি উৎসব প্রিয় জাতি

বর্ষবরণ পৃথিবীর প্রায় সকল জাতিসত্তাই যার যার মতো করে উদযাপন করে থাকে। পয়লা বৈশাখকে বর্ষশুরুর দিন হিসেবে সুনির্দিষ্ট করার অনেক আগে থেকেই কৃষিজীবী বাঙালি ফসল বোনা আর ফসল ঘরে তোলা নিয়ে নানা উত্সব করে আসছিল। পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীর মানুষ থেকে শুরু করে ধর্ম নির্বিশেষে সকল বাঙালি মুখর হয়েছে এসব লোকজ উত্সবে। মোগল যুগে সম্রাটের অন্তঃপুরে নওরোজ উত্সবের আয়োজন হতো। পারস্য থেকে এই নববর্ষ পালনের ধারা মোগল অন্তঃপুরে জনপ্রিয় হয়ে পড়েছিল। এ ধারা আলোড়িত করে ভারতীয় জনমানসকে।

হাজার বছর ধরে বেড়ে ওঠা বাঙালি সংস্কৃতি লোকজ ধারার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে। প্রাচীন বাংলায় বৌদ্ধ মতাদর্শের মধ্য দিয়ে মরমি ধারার নাথ মতবাদ সাধারণ মানুষের নৈকট্য পেয়েছিল। ব্রাহ্মণ সেন রাজাদের ধর্মীয় রক্ষণশীলতা সাধারণ বাঙালিকে বন্দি করতে চেয়েছিল ঠিকই কিন্তু তেরো শতকের পরে মুসলমান সুলতানদের আগমন ও পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙালি আবার ঘুরে দাঁড়ায়। সুলতানি ও মোগল যুগের প্রায় ছয়শ বছর বাঙালি লোকজ সংস্কৃতির চর্চা করেছে। শত শত বছর সুফি সাধকদের মরমিবাদী আচরণ ইসলামের মানবিক আবেদনকেই মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনারই বিকাশ ঘটেছে। সামাজিক-ধর্মীয় বাস্তবতা ও সুফিদের মানবিক আচরণ ইসলাম প্রচারের স্রোত তৈরি করেছিল।

কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদ যখন এই জোয়ার থামাতে পারেনি তখন ষোলো শতকে শ্রীচৈতন্য দেব তাঁর নব্যবৈষ্ণব আন্দোলন নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। এখানেও ছিল মরমী ধারা। মানুষের প্রতি ভালোবাসা। আর এভাবেই অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিজয় হয়। ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু ধর্ম ও সমাজ রক্ষা করতে পেরেছিলেন চৈতন্য দেব। এই যে দীর্ঘকালীন মরমি ধারার মিশ্রণ এরই অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়ায় মোগল যুগের শেষ দিকে এসে বাউল মতবাদের বিকাশ ঘটে। ধর্ম-সংস্কৃতির এই মানবিক দিকটি আবহমানকালের বাঙালি আপন করে নিয়েছে।