তিন নোবেল বিজয়ীর শান্তির কথা | |

তিন নোবেল বিজয়ীর শান্তির কথা

সম্প্রতি নোবেল উইমেনস ইনিশিয়েটিভ এবং নারী পক্ষের উদ্যোগে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে এসেছিলেন শান্তিতে তিন নোবেল বিজয়ী। উত্তর আয়ারল্যান্ডের মারেইড ম্যাগুয়ার, ইরানের শিরিন এবাদি ও ইয়েমেনের তাওয়াক্কল কারমান।

মিয়ানমার মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে : মারেইড ম্যাগুয়ার

মানবাধিকার রক্ষা করাই গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, নির্যাতন চালিয়ে মানবাধিকার লংঘন করেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী দ্বারা ৯০ শতাংশ রোহিঙ্গা নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে তা প্রমাণিত হয়েছে।

অংসান সু চি একজন নারী হয়ে কিভাবে চুপ করে আছেন। সেটা বুঝতে পারছি না। তাদের মুখে ধর্ষণের নিশংসতার গল্প শুনে আমাদের চোখে পানি চলে এসেছে। এই অপরাধে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমার সরকারের শাস্তি দাবি করছি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দ্বারা নির্যাতন, গণহত্যার শিকার হয়ে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে। মিডিয়া গণহত্যা, নির্যাতনের এই তথ্যবহুল ঘটনাগুলো সংবাদ আকারে জনসমক্ষে পরিবেশন করতে পারে।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে সরকার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। মিডিয়ার মূল লক্ষ্য হওয়া দরকার এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ গল্পের আকারে পরিবেশন না করে পর্যবেক্ষণ করে জনসমক্ষে পরিবেশন করা। এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কে জনগণের মতামত নেয়াও মিডিয়ার কাজ। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়ার যুদ্ধের পক্ষে অনেক গণমাধ্যম জনমত তৈরিতে সাহায্য করেছে। কোনো সংবাদমাধ্যম তথ্য গোপন করেছে। ভুল তথ্যও দিয়েছে।

বাংলাদেশের সরকার মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সংলাপ করছে। মানবাধিকার দূতদের সঙ্গে সংলাপ করছে। আলোচনা করছে। রোহিঙ্গারা তাদের বাসস্থানে ফিরে গেলে মিয়ানমার সরকারকেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকার যদি নীরব ভূমিকা পালন করে তাহলে গণমাধ্যম কর্মীদের সোচ্চার হতে হবে।

মারেইড ম্যাগুয়ারের জন্ম উত্তর আয়ারল্যান্ডে ১৯৪৪ সালের ২৭ জানুয়ারি। তারা পাঁচ বোন দুই ভাই। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় একটি বেসরকারি ক্যাথলিক স্কুল সেন্ট ভিনসেন্টস প্রাইমারি স্কুলে। বাবা-মায়ের তার স্কুলের বেতন চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য তিনি চৌদ্দ বছর বয়সে বেবিসিটারের কাজ করেন।

এই অর্থ জমিয়ে তিনি মিস গর্ডনস কমার্শিয়াল কলেজে এক বছরের ব্যবসা বিষয়ক ক্লাস করেন। এভাবেই তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেন। ১৯৭৬ সালের ১০ আগস্ট তার ছোট বোন অ্যানি তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন।

হঠাৎ করে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি আর ব্রিটিশ আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। একজন ড্রাইভারের ওপর তারা গুলি চালালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার বোন ও বাচ্চাদের আঘাত করে। সবাই মারা যায়। শান্তিরক্ষায় ফিলিস্তিন এবং ক্যাথলিকের ২০০-এর বেশি নারী স্বাক্ষরসহ শান্তি পিটিশন নিয়ে মার্চ করতে করতে মারেইড ম্যাগুয়ার এর বাড়িতে আসেন। তিনি এবং বেটি উইলিয়াম তাদের যৌথভাবে নেতৃত্ব দেন। দ্বিতীয় মার্চে এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১০ হাজারে।

আইরিশ রিপাবলিকান আর্মিরা মারেইড ম্যাগুয়ার ও বেটি উইলিয়ামসহ সব মার্চকারীর ওপর শারীরিকভাবে আক্রমণ চালায়। ‘ওমেন অ্যান্ড পিচ’ নামে এই শান্তির মিছিলে ৩৫ হাজার লোক যুক্ত হয়। আইরিশ প্রেস করসপন্ডেট কিয়ারান মেকওয়ান তাদের সঙ্গে যোগ দেন। উত্তর আয়ারল্যান্ডে শান্তিরক্ষা বিষয়ক কর্মকাণ্ডের জন্য ১৯৭৬ সালে তিনি এবং বেটি উইলিয়াম নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। মারেইড ম্যাগুয়ার এখনও বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বিশ্বের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে কাজ করছেন।

আন্তর্জাতিক আদালতে দোষীদের শাস্তি দাবি করছি : তাওয়াক্কল কারমান

গণহত্যার সংজ্ঞায় যা যা বলা আছে তার সবই ঘটেছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। আন্তর্জাতিক আদালতে এই দোষীদের শাস্তি দাবি করছি- বললেন তাওয়াক্কল কারমান। তিনি আরও বলেন, আরব দেশের দুর্নীতি, সম্পত্তির অধিকার আদায়, নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি অধিকার রক্ষায় আমি সংগ্রাম করেছি। একজন সাংবাদিক হিসেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি আমার সমস্যার মুখোমুখি হব। তা অর্থনৈতিক সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতা, স্বাধীনতাহীনতা ইত্যাদি যে কোনো সমস্যাই হোক না কেন?

সরকার সাংবাদিকদের ভয় পেয়ে জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নারী সাংবাদিক তৈরির সংগঠনটি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আমি দমে যাইনি। আমি আমার সংগঠনকে প্রতিষ্ঠা করব এটা ছিল একটা বড় চ্যালেঞ্জ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য ২০০৫ সালে নারী সাংবাদিক তৈরিই ছিল আমার লড়াই।

পত্রিকা, ওয়েবসাইটে নারী সাংবাদিকরা কাজ করছেন। তারা কলম ধরেছেন মানবাধিকার রক্ষায়। কেবিনেটের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসি। এ কারণে ইয়েমেন সরকার আমার ও আমার সতীর্থদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়। লক্ষ্য থেকে সরে আসিনি আমরা। আমাদের বিপ্লবের কারণে রাষ্ট্রপতি আব্দুল্লাহ রাবুহ মনসুর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কারণ তিনি হাউথিস এবং আল কায়েদাকে সমর্থন করেছিলেন। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

তাওয়াক্কল কারমানের জন্ম ১৯৭৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইয়েমেনের তাইজে। তিনি বেড়ে ওঠেন তাইজে। তিনি সানা ইউনিভার্সিটি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইয়েমেন থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং সানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক করেন।

কানাডার আলবার্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন ২০১২ সালে। পেশায় তিনি একজন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং মানবাধিকার কর্মী হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। তাকে ‘আইরন ওমেন’ এবং ‘মাদার অব দ্য রেভ্যুলেশন’ নামে ডাকত।

২০১১ সালে তিনি দ্বিতীয় মুসলিম নারী হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু আরব দেশের ইয়েমেনের তিনি প্রথম নারী যিনি এই পুরস্কার পান। তার বাবা আব্দেল সালাম খালেদ কারমান একজন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। মা আনিসাহ হোসেইন আব্দুল্লাহ আল আসওয়াদি। তারা ছয় বোন, তিন ভাই। তার বোনদের কেউ সাংবাদিক, কেউ কবি।

মুসলিম দেশের পক্ষ থেকে আমি লজ্জিত : শিরিন এবাদি

শিরিন এবাদি বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, নারী-মেয়েশিশুকে ধর্ষণ, নির্যাতন ইত্যাদি ঘটনায় মুসলিম দেশের পক্ষ থেকে আমি লজ্জিত। আমি সরকারি নীতির বিরোধিতা করায় ইরান সরকারও আমার মতামত পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। তারা আমার বোন, স্বামী জাভাদ টাভাসোলিয়নকে তুলে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন করে। আমার সম্পত্তি ক্রোক করে। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। গণতন্ত্র রক্ষায় অবিচল ছিলাম।

ইরানের গণমাধ্যম অর্থাৎ সংবাদপত্র, টেলিভিশন কখনও অন্যান্য দেশের মুসলিমদের ওপর নির্যাতন, গণহত্যা বিষয়ক সংবাদ পরিবেশন করে না। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন, সহিংসতা, গণহত্যার সংবাদও প্রকাশ করেনি। এক্ষেত্রে ইরানের গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারত।

এছাড়া তিনি বলেন, বিশ্বের সব দেশেই নারীরা কমবেশি বৈষম্যের শিকার হন। পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির কারণেই নারীদের প্রতি এই বৈষম্য রোধ করা যাচ্ছে না। ধর্মও অনেক ক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার হচ্ছে।

শিরিন এবাদির জন্ম ১৯৪৭ সালের ২১ জুন ইরানের হামাদনে। তার পরিবার ১৯৪৮ সালে সপরিবারে তেহরানে বসবাস শুরু করেন। তার বাবা মোহাম্মদ আলী এবাদি ছিলেন সিটি চিফ নোটারি পাবলিক এবং কর্মাশিয়াল ল’য়ের অধ্যাপক। তিনি ১৯৬৫ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন।

১৯৬৯ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক করেন। ১৯৭১ সালে তিনি আইনে ডক্টরেক্ট ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ইরানের একজন স্বনামখ্যাত আইনজীবী। তিনি সাবেক বিচারক এবং মানবাধিকার কর্মকাণ্ড এবং ইরানের ডিফেন্ডার অব হিউম্যান রাইটস সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা। তেহরান সিটি কোর্টের তিনি প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলাম বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের নামে চরম নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই নৈরাজ্য নিরসনে তিনি কাজ করতে শুরু করেন। ইরানের গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার রক্ষা বিশেষ করে নারী, শিশু এবং শরণার্থী অধিকার রক্ষা ইত্যাদি অবদানের জন্য ২০০৩ সালের ১০ অক্টোবর নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তিনি প্রথম ইরানিয়ান এবং মুসলিম নারী যিনি এই পুরস্কার লাভ করেন। তার এই পুরস্কার অর্জনকে ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ খাতামি কটূক্তি মন্তব্য করেন। শিরিন এবাদি তেহরানে বাস করতেন। কিন্তু তিনি ২০০৯ সালের জুনে ইউকেতে ছিলেন। এ কারণে তার ইরানিয়ান নাগরিকত্ব বাতিলের চেষ্টা করা হয়।——– যুগান্তর