আপনার সন্তানও কি যৌন নিপীড়ন থেকে নিরাপদ? | |

আপনার সন্তানও কি যৌন নিপীড়ন থেকে নিরাপদ?

প্রতিচ্ছবি ডেস্কঃ শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের পরিসংখ্যান দিনদিন ভারীই হচ্ছে ৷ তবে শুধু আইনি কঠোরতা নয়, সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে না পারলে পালটাবে না এই চিত্র। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, আমরা সবাই এটা বিশ্বাস করি। এই সদ্য প্রস্ফুটিত কলিটি একদিন হবে ফলদায়ী বৃক্ষ। তাই এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ।

কিন্তু আপনার শিশুটি কি সেই নিরাপদ পরিবেশ পাচ্ছে? একটু ভেবে দেখুন। সে যাদের সাথে খেলছে, সে যাদের কাছ থেকে আদর পাচ্ছে (বিশেষত আপনার আত্মীয়স্বজন), আপনার পাড়া প্রতিবেশি, যেখানে বেশিক্ষন সময় থাকছে, যারা আপনার বাড়িতে আসা-যাওয়া করছে এই সব কিছুই তার জন্য নিরপদ কিনা?

নিপীড়ক হতে পারে যে কেউ। গবেষণায় দেখা গেছে, নিপীড়কদের ৮৫ শতাংশই হচ্ছে আক্রান্ত শিশুর পরিচিতজন। এ ছাড়া গৃহশিক্ষক, বাসার গৃহকর্মী, সমবয়সী বন্ধু, বড় ক্লাসের ছাত্রছাত্রী, বড় ভাইবোনের বন্ধু-বান্ধবী, গাড়িচালক, অপরিচিতজন যে কারও দ্বারা ছেলেশিশুর নিপীড়নের ঘটনা ঘটতে পারে। পুরুষ বা নারী যে কাউকে নিপীড়কের ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। যৌন নিপীড়ন ছাড়াও নানা রকম অপরাধের (মাদক ব্যবসা, চোরাই পণ্যের বিপণন) সঙ্গে ছেলেদের জড়িয়ে ফেলতে পারে যে কেউ। বর্তমানে মেয়ের পাশাপাশি বাড়ির ছেলেশিশুকে নিয়েও উদ্বিগ্ন মা। তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে না তো?

আপনার ছেলেটি ইদানীং ঘুমের ভেতর কেঁদে উঠছে। নিজেকে গুটিয়ে রাখে, বন্ধুদের সঙ্গে আগের মতো খেলে না। হঠাৎ করে রেগে যায়, মন খারাপ করে রাখে। ওর মা-বাবা দুজনেই যথেষ্ট সচেতন; তাঁরা ওকে নিয়ে গেলেন একজন মনোচিকিৎসকের কাছে। দীর্ঘক্ষণ ছেলেটির সঙ্গে আলাপ করে মনোচিকিৎসক জানতে পারলেন, ছেলেটি তাঁর কাছের আত্মীয় দ্বারা নিপীড়নের শিকার হয়েছে।

মা-বাবার অজান্তে নানাভাবে নিপীড়নের শিকার হতে পারে শিশুরা। তা সে শিশু মেয়েই হোক আর ছেলেই হোক। মানসিক নিপীড়ন, শারীরিক নিপীড়ন ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটতে পারে ছেলেশিশুদের সঙ্গেও। তাঁর নিরাপত্তা হয় বিঘ্নিত। ক্রমাগত তাকে উত্ত্যক্ত করা, হুমকি দেওয়া, পর্নোগ্রাফিতে উৎসাহিত করা, মিথ্যা কথা বলা, চোরাই জিনিসপত্র বিশেষ করে চোরাই মুঠোফোন-ল্যাপটপের বিপণনে ছেলেশিশুদের ব্যবহার করা, মাদক সেবনে উৎসাহিত করা ও পরে মাদকের ব্যবসায় তাদের কাজে লাগানোর মতো ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে ছেলেশিশুরা। নিয়ত এই নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় থাকতে থাকতে তার মনোজগতে পরিবর্তন ঘটে। মিথ্যা বলা, চুরি করা, অবাধ্য আচরণ করা, পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হওয়া, মাদকাসক্ত হওয়াসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় পড়ে যায় সে।

যৌন নিপীড়ন বিষয়ে একটা সাধারণ ধারণা রয়েছে যে শিশুদের মধ্যে কেবল মেয়েরাই এর শিকার হয়। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখা যায় মেয়েশিশুদের পাশাপাশি ছেলেশিশুরাও এ ধরনের নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। সেন্ট্রাল ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৮ বছরের নিচে মার্কিন শিশুদের মধ্যে ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ মেয়ে আর ১৬ শতাংশ ছেলে যৌন নির্যাতনের শিকার; অর্থাৎ প্রতি চারজন মেয়ের মধ্যে একজন আর প্রতি ছয়জন ছেলের মধ্যে একজন জীবনে কমপক্ষে একবার যৌন নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছে। মেয়েশিশুদের পাশাপাশি ছেলেশিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি।

শিশুকে নিরাপদে রাখার জন্য মা-বাবাকে যে বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে—

# সন্তানদের সাথে এমন সম্পর্ক গড়ে তোলা যেন তারা আপানাকে সব বিষয়ে ভরসা করে। যে কোন কথা আপনার কাছে বলতে দ্বিধাবোধ না করে। সব সমস্যার কথা আপনাকে বলতে পারে।

# তাকে তার শরীরের সংবেদনশীল স্থানগুলো সম্পর্কে জ্ঞান দিতে হবে। পশ্চাতদেশ, বুক কিংবা দুই পায়ের মাঝে কেউ যেন হাত না দেয়। বাবা-মা দাদা-দাদি(তাও প্রয়োজনে) কিংবা ডাক্তার বাদে কেউ যেন হাত না দেয়। দিলে ওখান থেকে চিৎকার দিয়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হবে।

# ছেলেশিশুর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা শিথিল করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, মেয়েশিশুর মতো তারও নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানেরা মা-বাবার নজরদারি পছন্দ করে না। এটি মাথায় রেখেই শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

# সন্তানকে তার নিরাপত্তার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতে হবে, কোথায় কার কাছ থেকে সতর্ক থাকতে হবে তা জানানো জরুরি।

# সন্তানকে তার বয়স অনুযায়ী যৌন বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিতে হবে, শিশুকে তার শরীরের বিভিন্ন অংশের নাম শেখাতে হবে, শরীরের যে চারটি অতি ব্যক্তিগত স্থান—মুখ, বুক, নিতম্ব ও প্রজনন–অঙ্গের নিরাপত্তার বিষয়ে তাকে প্রয়োজনীয় ধারণা দিতে হবে।

# মা-বাবাকে কেবল নিজে সচেতন হলেই হবে না, পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং প্রয়োজনে শিশুর সহপাঠীদের বাবা-মাকেও বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা।

# যাদের দ্বারা নিপীড়নের শিকার হতে পারে (বিশেষ করে কাছের কেউ) তাদের কোনো কোনো আচরণকে আস্থায় এনে সতর্ক হতে হবে তা শিশুকে জানানো।

# যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে গেলে লোকলজ্জার ভয়ে চুপ করে না থেকে নিপীড়ককে আইনের আওতায় আনা, তা সে যত আপনজনই হোক না কেন। নয়তো নিপীড়ক পরবর্তী সময়ে অন্যান্য শিশুকেও নিপীড়ন করতে পারে।

# নিপীড়নের শিকার হওয়া শিশুর মধ্যে কোনো মানসিক সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত তাকে চিকিৎসার আওতায় আনা। তাকে দায়ী করা ঠিক হবে না, তিরস্কার করা যাবে না। বরং বোঝাতে হবে যে এ ঘটনায় তার নিজের কোনো দোষ নেই। তার জন্য মানসিক চিকিৎসার পাশাপাশি শারীরিক চিকিৎসারও প্রয়োজন হতে পারে।